মুদ্রানীতি কমিটি থেকে সাদিক আহমেদের পদত্যাগ: অনিশ্চয়তায় সুদহার

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল ও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের জেরে ব্যাংক খাতে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নবনিযুক্ত গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর বাজারভিত্তিক সুদহার কমানোর যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা শুরুতেই বাধার মুখে পড়েছে। বুধবার (৪ মার্চ) অনুষ্ঠিতব্য মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) গুরুত্বপূর্ণ সভাটি আকস্মিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এর পরপরই কমিটির একমাত্র মনোনীত সদস্য ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সাদিক আহমেদের পদত্যাগের খবর সামনে আসে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান নীতিগত অবস্থান নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সভার লক্ষ্য ও স্থগিতের নেপথ্য কারণ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নিয়েই বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঋণের সুদহার কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করেন। বর্তমানে দেশে নীতি সুদহার (Repo Rate) ১০ শতাংশে অবস্থান করছে। গভর্নর চেয়েছিলেন এই হার শূন্য দশমিক ২৫ থেকে শূন্য দশমিক ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে আনতে, যাতে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা খরচ কমে এবং গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদহার হ্রাস পায়।

তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে সুদহার কমানোর এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এই নীতিগত দ্বন্দ্ব এবং সাদিক আহমেদের মতো অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদের পদত্যাগ সভাটি স্থগিত হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির বর্তমান কাঠামো

সাত সদস্যবিশিষ্ট এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি দেশের মুদ্রাবাজার ও সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কমিটির বর্তমান সদস্যবৃন্দ হলেন:

পদবিনামভূমিকা
চেয়ারম্যানমো. মোস্তাকুর রহমানগভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।
সদস্যমো. হাবিবুর রহমানডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।
সদস্যমো. আখতার হোসেনপ্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক।
সদস্যএ কে এনামুল হকমহাপরিচালক, বিআইডিএস।
সদস্যফেরদৌসী নাহারচেয়ারম্যান, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাবি।
সদস্যমাহমুদ সালাহউদ্দিন নাসেরনির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।
সদস্য (পদত্যাগী)সাদিক আহমেদভাইস চেয়ারম্যান, পিআরআই (সাবেক সদস্য)।

সাদিক আহমেদের পদত্যাগ ও এর তাৎপর্য

সাদিক আহমেদ বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং বর্তমানে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। উল্লেখ্য, বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরও পিআরআই-এর নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। সাদিক আহমেদ মুদ্রানীতি কমিটির একমাত্র সদস্য ছিলেন যাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সরাসরি মনোনীত করেছিল। তার পদত্যাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘কঠোর মুদ্রানীতি’ থেকে ‘উদার মুদ্রানীতি’র দিকে ধাবিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিআইডিএস-এর মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক জানিয়েছেন, মঙ্গলবার বিকেলেই সভাটি স্থগিতের কথা জানানো হয় এবং পরবর্তী সভা পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য সুদহার কমানোর এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হবে নাকি নেতিবাচক, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে গভীর বিভাজন তৈরি হয়েছে।

বাজার ও বিনিয়োগে প্রভাব

বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে ঋণের সুদহার কমানোর দাবি জানিয়ে আসলেও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এনে সুদহার কমালে হিতে বিপরীত হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের পদত্যাগ ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, নতুন গভর্নর তার সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন নাকি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতিই বজায় রাখেন।