আফগানিস্তানের কাবুলে অপুষ্টি চিকিৎসাকেন্দ্র এখন যেন এক নীরব মৃত্যুঘর—যেখানে শিশুর কান্না থেমে গিয়ে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে চিকিৎসাসেবা, ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অসুস্থ শিশুদের, ছাঁটাই করা হয়েছে বহু স্বাস্থ্যকর্মী।
সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত একটি অপুষ্টি নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা করত আন্তর্জাতিক এনজিও অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গার (এএসএফ)। যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি সহায়তা বন্ধ করায় কেন্দ্রটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানায় বার্তা সংস্থা এএফপি।
সংস্থাটির আফগানিস্তান পরিচালক কোবি রিটভেল্ড বলেন, “এই কেন্দ্রটি যেসব শিশুদের চিকিৎসা দিত, এখন তারা সেবা পাবে না। চিকিৎসার অনুপস্থিতিতে তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক বেশি।”
চলতি বছরের মার্চে শেষ শিশুটির চিকিৎসা শেষে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে খেলনা, শিশুখাদ্য, ওষুধ এবং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ফার্মেসি।
চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক ফারিদ আহমাদ বারাকজাই বলেন, “অপুষ্ট শিশুকে ফিরিয়ে দেওয়াটা আমাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ আমরা জানি, এই শিশুরা হয়তো অন্য কোথাও এমন সেবা পাবে না।”
জাতিসংঘের মতে, আফগানিস্তান বর্তমানে সুদানের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মানবিক সংকটে রয়েছে। চার দশকের যুদ্ধের পর গড়ে প্রতি মাসে কেন্দ্রটিতে ৬৫টি জটিল অপুষ্টির শিকার শিশুর চিকিৎসা হতো, যা তাদের মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনত।
রিটভেল্ড বলেন, “যে কোনো সংক্রমণ একটি অপুষ্ট শিশুকে সহজেই কাবু করে ফেলে। এ ধরনের সেবার বিকল্প দেশে নেই বললেই চলে।”
অফগান জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশই ১৪ বছরের নিচে, তাই শিশুদের অপুষ্টি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ জানায়, বর্তমানে পাঁচ বছরের নিচে ৩৫ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে এবং বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ হারে বামনত্ব রয়েছে আফগানিস্তানে।
এই সংকট শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ, যাদের মধ্যে ৩.১ মিলিয়ন দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে।
সম্প্রতি বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) জানায়, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সংস্থাটির কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়েছে, যদিও অন্য দেশগুলোতে সহায়তা আবার চালু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আফগানিস্তান প্রতিনিধি এডউইন সেনিজা সালভাদোর বলেন, “এই ভঙ্গুর ব্যবস্থায় এমনকি প্রাথমিক স্ক্রিনিং ব্যবস্থাও নেই। যার ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।”
এই তহবিল সংকটে মানবিক সহায়তাক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০২৪ সালে দেশের বেকারত্বের হার ১২.২ শতাংশে পৌঁছেছে। অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গার তাদের ৯০০ কর্মীর মধ্যে ১৫০ জনকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে।
রিটভেল্ড বলেন, “মানুষ আমার অফিসে এসে কাঁদে। আমরা কেবল সহানুভূতি জানাতে পারি, কিন্তু চাকরি দিতে পারি না।”
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারী কর্মীরা। তালেবানের কড়াকড়ির মধ্যে এই চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল তাদের জন্য বিরল কর্মক্ষেত্র। ৪০ জন কর্মীর অধিকাংশই ছিলেন নারী, যাদের ওপর কাজ ও শিক্ষার ক্ষেত্রে এখন কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। জাতিসংঘ একে বলছে ‘লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদ’।
২৭ বছর বয়সী নার্স ওয়াজমা নূরজাই বলেন, “এই চিকিৎসাকেন্দ্রই ছিল আমাদের জীবিকা। এখন সেটাও চলে যাচ্ছে হাতছাড়া হয়ে।”
যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান স্থানীয় বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ জোগান দিত। এই সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংস্থাটি এখন বিকল্প উৎস খুঁজছে, দাতাদের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে—তবে রিটভেল্ড মনে করেন, এই ঘাটতি পূরণ করা প্রায় অসম্ভব।
