মার্কিন শুল্কের প্রভাব ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশের ওপর সমান নয়

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর সমানভাবে নির্ভরশীল নয়, তাই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যগুলোতে ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন, তবুও সব দেশের ক্ষতির মাত্রা একই হবে না।

প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, আয়ারল্যান্ড ও জার্মানি মার্কিন বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিকারক দেশ। বিশেষ করে ওষুধ, গাড়ি, ইস্পাত ও যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে তাদের ওপর শুল্কের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে।

ফ্রান্সের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, বিমান শিল্প, খাদ্য, ওয়াইন ও বিলাসবহুল পণ্যের খাতে কোম্পানিগুলো মার্কিন বাজার হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে।

মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অধীন ব্যুরো অফ ইকোনমিক অ্যানালাইসিস (বিইএ) জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ২৩৫.৬ বিলিয়ন ডলার, যা চীনের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর মধ্যে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ৮৬.৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে, যা ইইউর মধ্যে সর্বোচ্চ। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বড় বড় ওষুধ কোম্পানি যেমন ফাইজার, এলি লিলি ও জনসন অ্যান্ড জনসনের আয়ারল্যান্ডে অবস্থিত কার্যক্রম প্রধান ভূমিকা রাখে। তারা আয়ারল্যান্ডের ১৫ শতাংশ কর সুবিধার কারণে এখানে তাদের ওষুধের পেটেন্ট নিবন্ধন করে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করে থাকে, যেখানে ওষুধের দাম বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি।

আয়ারল্যান্ডে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল, গুগল ও মেটার ইউরোপীয় সদরদপ্তর রয়েছে, যারা করবান্ধব আইরিশ ব্যবস্থার কারণে এখানে অবস্থান নিয়েছে।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ২২.৫ শতাংশই ওষুধ খাত থেকে আসে, যেখানে অনেক বড় কোম্পানি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ঘোষণা করেছে।

জার্মানি, যা ইইউর সর্ববৃহৎ অর্থনীতি, বিশেষভাবে রপ্তানিনির্ভর। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জার্মানির বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৮৪.৮ বিলিয়ন ডলার। এর পেছনে রয়েছে বৃহৎ অটোমোবাইল, রাসায়নিক, ইস্পাত ও যন্ত্রপাতি শিল্প। মার্সিডিজ বেঞ্জের মোট আয়ের ২৩ শতাংশ মার্কিন বাজার থেকে আসে, যদিও কিছু অংশ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এসইউভি রপ্তানি থেকে আসে, যা সম্ভাব্য শুল্কের আওতায় আসতে পারে।

ফেডারেশন অব জার্মান ইন্ডাষ্ট্রিজ (বিডিআই) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণার পর দ্রুত সমাধান খোঁজার ও উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।

মার্কিন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতালি ও ফ্রান্স যথাক্রমে ৪৪ বিলিয়ন ও ১৬.৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে। যদিও ফরাসি পরিসংখ্যানে উদ্বৃত্ত কম দেখানো হয়েছে। তাই ধারণা করা হয় তারা তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে খাদ্য ও ওয়াইন শিল্পে তারা বড় ধরনের প্রভাব অনুভব করতে পারে, যেমনটা স্পেনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ফরাসি কৃষক ইউনিয়ন এফএনএসইএ-এর আঙ্গুরচাষ শাখার প্রধান জেরোম ডেস্পে বলেছেন, ৩০ শতাংশ শুল্ক ফরাসি ওয়াইন ও স্পিরিট শিল্পের জন্য ‘বিপর্যয়জনক’।

ইতালির প্রধান কৃষি সংস্থা কোল্ডিরেত্তি জানায়, এই শুল্কের কারণে মার্কিন ভোক্তা ও ইতালীয় খাদ্য উৎপাদনকারীদের প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে।

ইতালির মোটরগাড়ি শিল্প নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ফ্রাঙ্কো-ইতালীয় নির্মাতা স্টেলান্টিস (বিশেষ করে ফিয়াট ও পিউজো) শুল্কের অনিশ্চয়তার কারণে বছরের পূর্বাভাস স্থগিত করেছে।

ফ্রান্সের ঝুঁকিপূর্ণ খাতের মধ্যে রয়েছে বিমান ও বিলাসবহুল পণ্যের শিল্প। এলভিএমএইচ, বিশ্বের বৃহত্তম বিলাসবহুল সামগ্রীর গ্রুপ, তাদের মোট বিক্রির এক-চতুর্থাংশ মার্কিন বাজার থেকে পায়।

ফ্রান্সের মহাকাশ খাতের রপ্তানির প্রায় এক পঞ্চমাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়, যার বড় অংশ এয়ারবাসের তৈরি বিমান ও প্রযুক্তি।

অস্ট্রিয়া ও সুইডেনও যথাক্রমে ১৩.১ বিলিয়ন ও ৯.৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।