খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জানুয়ারি ২০২৬, ২:৪৬ পিএম

বাংলা সাহিত্য ও মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে মহাশ্বেতা দেবী এক অনন্য অবস্থান দখল করেছেন। তিনি ছিলেন কেবল শক্তিমান কথাসাহিত্যিকই নন, বরং শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের—বিশেষ করে ভারতের আদিবাসী সম্প্রদায়, বিশেষ করে সাঁওতাল এবং সমাজের অবহেলিত নারীদের—এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। তার সাহিত্যকর্মের মূল সুর ছিল প্রতিবাদ, মানবিকতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার।
বিশ্বসাহিত্যে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন তার সর্বাধিক আলোচিত উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’ দ্বারা। নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই রচনায় এক মায়ের অন্তর্গত বেদনা, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নির্মম বাস্তবতা এবং সামাজিক অসঙ্গতি ফুটে ওঠে, যা বাংলা সাহিত্যে এক অনিবার্য ক্লাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
Table of Contents
মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ তৎকালীন ঢাকায়, একটি শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক মধ্যবিত্ত পরিবারে। তার পিতা মনীশ ঘটক ছিলেন কল্লোল যুগের খ্যাতিমান সাহিত্যিক। কাকা ছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক, যাঁর শিল্পচেতনা মহাশ্বেতার মনন ও চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
মহাশ্বেতা দেবীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় শান্তিনিকেতন থেকে। পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬৪ সালে তিনি বিজয়গড় কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সময়ে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় সক্রিয় হন। ধীরে ধীরে তিনি কেবল লেখকই হননি, তিনি মাঠপর্যায়ে কাজ করা একজন মানবাধিকার কর্মীও হয়ে ওঠেন—যিনি আদিবাসী গ্রাম থেকে আদালত পর্যন্ত লড়াই করেছেন।
মহাশ্বেতা দেবীর লেখার মূল বিষয় ছিল—
আদিবাসী সমাজের ভূমি অধিকার
রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন
নারীর শরীর ও শ্রমের ওপর দখলদারি
ইতিহাসে চাপা পড়ে যাওয়া সত্য
তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে কয়েকটি নিচের টেবিলে সংক্ষেপে প্রদর্শিত হলো:
| সাহিত্যকর্ম | প্রকাশক/বছর | মূল বিষয়বস্তু |
|---|---|---|
| হাজার চুরাশির মা | ১৯৭৪ | নকশাল আন্দোলন ও একজন মায়ের যন্ত্রণা |
| অরণ্যের অধিকার | ১৯৭৭ | আদিবাসী ভূমি অধিকার |
| রুদালী | ১৯৮৩ | নারীর বেদনা ও সামাজিক চাপে প্রতিফলন |
| স্তনদায়িনী | ১৯৮৫ | নারীশক্তি ও শোষণ |
| তিতু মীর | ১৯৮০ | বীরত্ব ও প্রতিরোধ |
মহাশ্বেতা দেবী অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছেন, যেমন:
| পুরস্কার | সাল | উল্লেখযোগ্যতা |
|---|---|---|
| জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৬ | ভারতীয় সাহিত্যে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি |
| র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার | ১৯৯৭ | আন্তর্জাতিক মানবাধিকার স্বীকৃতি |
| পদ্মভূষণ | ২০০৬ | ভারত সরকারের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক সম্মান |
| সার্ক সাহিত্য পুরস্কার | ২০০৭ | দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যিক স্বীকৃতি |
মহাশ্বেতা দেবীর জীবনসঙ্গী ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচার্য। তাদের একমাত্র সন্তান নবারুণ ভট্টাচার্য, যিনি বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।
মহাশ্বেতা দেবী ২৮ জুলাই ২০১৬ সালে আমাদের মধ্যে আর নেই। কিন্তু তার লেখা, লড়াই এবং মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা আজও জীবিত। তিনি থাকবেন—
প্রতিবাদের ভাষায়
মানবতার সাহিত্যে
ইতিহাসের নৈতিক বিবেক হিসেবে
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মন্তব্য