ভোটের আগে গোপন হামলা, গুলি ও অবৈধ অস্ত্রের আতঙ্ক

নির্বাচনের আগমুহূর্তে দেশে নিরাপত্তাহীনতার অবস্থা ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। চোরাগোপ্তা হামলা, গুলি, হত্যা, বিস্ফোরণ, মব সন্ত্রাস এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার একের পর এক ঘটছে, যা ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে অন্তত চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে রাজধানীর ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারের নিকটস্থ তেজতুরী বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার গুলিতে মৃত্যু উল্লেখযোগ্য।

গাজীপুরে এনসিপির এক কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে, তবে তিনি অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন। এর আগে শরীয়তপুরের জাজিরায় ককটেল বিস্ফোরণে দুই যুবক নিহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, এই ককটেলগুলি নির্বাচনী প্রচারে হামলা বা নাশকতার জন্য তৈরি হচ্ছিল কিনা, তা তদন্তাধীন।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিচের টেবিলে সংক্ষেপে প্রদর্শিত হলো:

তারিখস্থানঘটনামৃত্যু/আহত
১৮ ডিসেম্বরভালুকা, ময়মনসিংহধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা১ মৃত্যু
১৯ ডিসেম্বরলক্ষ্মীপুরবিএনপি নেতার ঘরে আগুন, মেয়ের মৃত্যু১ মৃত্যু, ৩ দগ্ধ
৩১ ডিসেম্বরবসুন্ধরা, ঢাকামোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, মব সন্ত্রাসে আইনজীবী নিহত১ মৃত্যু
৩১ ডিসেম্বরডামুড্যা, শরীয়তপুরব্যবসায়ীকে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা১ মৃত্যু
৭ জানুয়ারিগাজীপুরএনসিপির কর্মীর ওপর গুলিঅল্পের জন্য রক্ষা

এই সহিংসতার মধ্যে নির্বাচনী নিরাপত্তার প্রধান চ্যালেঞ্জ হল অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র। ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শহীদ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। পরবর্তী ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’-তে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৫,৯৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও, পেশাদার সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের সংখ্যা ও অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা খুবই সীমিত। মাত্র ২৩৬টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, যার মধ্যে রাজধানীর বড় সন্ত্রাসী বা তাদের সহযোগীদের কাছ থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য অস্ত্র পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রাও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে প্রায় ৪,৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহিংসতা এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়া ঠেকাতে ভীতি প্রদর্শনের কারণে প্রার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গোপালগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী এস এম জিলানী বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা অবস্থায় সমর্থকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে নিরাপত্তা শঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন।

নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যেই বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়েছে। পুলিশের ১,৮৭,৬০৩ জন জনবল নির্বাচনকালীন দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সহিংসতার ধারাকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা এবং জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নির্বাচনের আগে এই সহিংসতা, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও মব সন্ত্রাস দেশের ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে। নির্বাচনী পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখা এবং ভোটার ও প্রার্থীদের আত্মরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদানই বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি।