ভূমিকম্পের মাত্রা ও তীব্রতা কীভাবে মাপা হয়?

ভূমিকম্প পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ ও অনিশ্চিত প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু একবার ভূমিকম্প শুরু হলেই বিজ্ঞানীরা খুব দ্রুত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা জানিয়ে দেন— মাত্রা (Magnitude) এবং তীব্রতা (Intensity) বা কম্পনের শক্তি। এই দুই শব্দকে একই অর্থে ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে তারা ভূমিকম্পের দুই ভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করে।

এই দীর্ঘ ব্যাখ্যামূলক নিবন্ধে আমরা জানব— মাত্রা এবং তীব্রতা আসলে কী, সেগুলো কীভাবে গণনা করা হয়, কেন একাধিক স্কেল ব্যবহার করা হয়, এবং বিশেষ করে বাংলাদেশসহ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য এর অর্থ কী।

Table of Contents

মাত্রা বনাম তীব্রতা: দুটি ভিন্ন ধারণা

মাত্রা (Magnitude)
  • ভূমিকম্পের মাত্রা নির্দেশ করে ভূকম্পন উৎসে ঠিক কত শক্তি মুক্তি পেয়েছে।
  • একটি নির্দিষ্ট ভূমিকম্পের মাত্রা সব জায়গায় একই থাকে।
  • সিসমোগ্রাফে রেকর্ড করা ভূকম্পন তরঙ্গের বিশ্লেষণ থেকে মাত্রা নির্ধারিত হয়।
তীব্রতা (Intensity)
  • তীব্রতা বোঝায় কোন স্থানে কম্পন কতটা জোরে অনুভূত হয়েছে এবং সেখানে কতটা ক্ষতি হয়েছে।
  • এটি স্থানভেদে ভিন্ন— কাছাকাছি এলাকায় বেশি, দূরে কম।
  • তীব্রতা নির্ধারিত হয় মানুষের অনুভূতি, ক্ষতির বিবরণ এবং বস্তুগত পর্যবেক্ষণ থেকে।
তফাৎটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

একটি মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প দুর্বল মাটি, ঘনবসতি বা দুর্বল স্থাপনার এলাকায় ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে, অর্থাৎ তীব্রতা বেশি হয়। অন্যদিকে বড় মাত্রার ভূমিকম্প দূরবর্তী বা সমুদ্র অঞ্চলে ঘটলে ক্ষতি কম হতে পারে।

শুধু মাত্রা শুনে কখনোই বোঝা যায় না— আপনার এলাকায় কম্পন কতটা শক্তিশালী হবে।

মাত্রা কীভাবে মাপা হয়?

ক) “রিখটার স্কেল”— ঐতিহাসিক সূচনা
  • ১৯৩০-এর দশকে চার্লস রিখটার এবং বেনো গুটেনবার্গ এই স্কেল তৈরি করেন।
  • এটি ভূকম্পন তরঙ্গের অ্যামপ্লিটিউড (কম্পনের উচ্চতা) এবং উৎস থেকে দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে।
  • প্রতিটি পূর্ণ মাত্রা বাড়লে (যেমন ৪.০ → ৫.০) তরঙ্গের উচ্চতা ১০ গুণ বাড়ে, আর শক্তি বাড়ে ৩১ গুণের বেশি
  • তবে রিখটার স্কেল বড় ভূমিকম্পে ‘স্যাচুরেট’ হয়ে যায়— অর্থাৎ বড় ভূমিকম্পের প্রকৃত শক্তি ঠিকমতো দেখাতে পারে না।
খ) ‘মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল’ (Mw) — আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি

বর্তমানে বিশ্বের সব ভূমিকম্প Moment Magnitude Scale (Mw) দিয়ে মাপা হয়।

এটি নির্ভর করে Seismic Moment (M₀) এর ওপর:

M0=μ×A×DM_0 = \mu \times A \times D

যেখানে—

  • μ = শিলার কঠোরতা
  • A = যে অংশে ফাটল বিস্তার করেছে
  • D = গড় স্লিপ (ভূমির স্থানচ্যুতি)

এ থেকে গণনা করা হয় বাস্তব মাত্রা, যেটি বড় ভূমিকম্পেও সঠিক ফল দেয়।

গ) অন্যান্য মাত্রা স্কেল
  • Body-wave magnitude (m_b)
  • Surface-wave magnitude (M_s)
  • Energy magnitude (M_e)

জনসাধারণের কাছে যে “ম্যাগনিটিউড” বলা হয়, তা প্রায় সব সময়ই Mw

ঘ) মাত্রা কেন লগারিদমিক?
  • মাত্রা ৬ → ৫–এর তুলনায় শক্তি ৩২ গুণ বেশি
  • মাত্রা ৭ → ৫–এর তুলনায় শক্তি ১,০০০ গুণ বেশি

অর্থাৎ মাত্রা সামান্য বাড়লে শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়

তীব্রতা কীভাবে মাপা হয়?

ক) মডিফাইড মার্কেলি স্কেল (MMI)
  • I (অনুভূত হয়নি) থেকে XII (সম্পূর্ণ ধ্বংস) পর্যন্ত একটি পর্যবেক্ষণ-ভিত্তিক স্কেল।
  • উদাহরণ:
    • VI → সবার কাছে অনুভূত, কিছু ভারী জিনিস নড়ে, হালকা ক্ষতি
    • X → বহু ভবন ধসে পড়ে, মাটিতে ফাটল
খ) ShakeMap ও যান্ত্রিক পরিমাপ
  • PGA, PGV, ভূতত্ত্ব, মানুষের অভিজ্ঞতা— সব মিলিয়ে ShakeMap তৈরি করা হয়।
  • এগুলো জরুরি সেবাদানকারী দলকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
গ) তীব্রতাকে প্রভাবিত করে যা
  • উৎস থেকে দূরত্ব
  • ভূমিকম্পের গভীরতা
  • মাটি/পলিমাটি/শিলার ধরন
  • ভবন নির্মাণের মান
  • ফাটলের দিক ও গতি
ঘ) কেন একই মাত্রাতেও ভিন্ন তীব্রতা হয়?

একটি কম গভীর, শহরের কাছে সoft soil অঞ্চলে হওয়া মাত্রা ৫.৮ ভূমিকম্প, গভীর সমুদ্রের মাত্রা ৭.০–এর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করতে পারে।

এই ধারণাগুলো আমাদের জন্য কী অর্থ বহন করে?

ক) মাত্রা থেকে যা জানা যায়
  • কত শক্তি নিঃসৃত হয়েছে
  • কোথায় ও কত গভীরে ফাটল হয়েছে
  • কত দূর পর্যন্ত কম্পন অনুভূত হতে পারে
খ) তীব্রতা থেকে যা জানা যায়

একজন সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— “আমার এলাকায় কম্পন কত জোরে অনুভূত হল?”

গ) বাংলাদেশে কেন দুইটিই জানা প্রয়োজন?

বাংলাদেশ তিনটি প্রধান টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত।
ফলে—

  • মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও বড় ক্ষতি করতে পারে
  • নরম মাটি কম্পনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়
  • ঘনবসতি ও দুর্বল নির্মাণশৈলী ঝুঁকি বাড়ায়
  • বড় দূরবর্তী ভূমিকম্পও সুনামি, liquefaction ঘটাতে পারে

 

কীভাবে বিজ্ঞানীরা ধাপে ধাপে মাত্রা ও তীব্রতা নির্ধারণ করেন?

মাত্রা নির্ধারণ
  1. বিশ্বব্যাপী সিসমোগ্রাফে তরঙ্গ রেকর্ড হয়
  2. তরঙ্গের উচ্চতা বিশ্লেষণ
  3. Seismic Moment গণনা
  4. Mw সূত্রে মাত্রা নির্ধারণ
  5. প্রাথমিক মাত্রা ঘোষণা, পরে পরিমার্জন
  6. গভীরতা, অবস্থান, শক্তি ইত্যাদি প্রকাশ
তীব্রতা নির্ধারণ
  1. কম্পন পরিমাপ, অনুভূতি-ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ
  2. স্থানভেদে ShakeMap তৈরী
  3. প্রত্যেক স্থানের জন্য MMI রেটিং
  4. ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা prioritis ব্যবহার
  5. উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত হয়

 

বিশেষ তথ্য ও সাধারণ ভুল ধারণা

  • রিখটার স্কেল পুরোনো; বড় ভূমিকম্পে সঠিক ফল দেয় না
  • মাত্রা != ক্ষতি; ক্ষতি নির্ভর করে তীব্রতা, মাটি, ভবন
  • “রিখটার স্কেল” শব্দটি ভুলভাবে ব্যবহৃত হয়
  • ক্ষুদ্র ভূমিকম্পের মাত্রা ০–এর নিচেও হতে পারে
  • পুরোনো ভূমিকম্পের মাত্রা অনুমান করতে তীব্রতা ব্যবহার করা হয়

 

আমাদের শহরে কম্পন কেমন হতে পারে

  1. ২০×১০ কিমি ফাটল, ১ মিটার স্লিপ
  2. Moment গণনা
  3. Mw ≈ ৬.৮
  4. সারা পৃথিবীর সিসমোগ্রাফে নিশ্চিত
  5. আপনি ৮০ কিমি দূরে, নরম মাটিতে
  6. সেখানে MMI VII–VIII তীব্রতা— ভবনে ক্ষতি সম্ভব
  7. দূরের শহরগুলোতে MMI IV–V মাত্র হালকা কম্পন

 

মূল পয়েন্ট

  • মাত্রা = শক্তি
  • তীব্রতা = কম্পনের অনুভূতি/ক্ষতি
  • মাত্রা লগারিদমিক
  • Mw সবচেয়ে বিশ্বস্ত
  • তীব্রতা স্থানভেদে পরিবর্তিত
  • দুর্যোগ ঝুঁকি নির্ভর করে তীব্রতা + নির্মাণ মানের ওপর
  • দুই ধারণাই জানা জরুরি

 

বিশ্বের ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে— বিশেষ করে বাংলাদেশে— শুধুমাত্র মাত্রা নয়, তীব্রতা ও প্রস্তুতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

শুধু “মাত্রা ৭.৫” শুনলে আসল ঝুঁকি বোঝা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো— কত জোরে কম্পন অনুভূত হয়েছে, ভবন কতটা স্থিতিশীল, আর আমরা কতটা প্রস্তুত।

মাত্রা ও তীব্রতার পার্থক্য বোঝা আমাদের সবাইকে — চিন্তাশীল, সচেতন ও দুর্যোগ-প্রতিরোধী সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।