ফেনী শহরের শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কে অবস্থিত একটি বেসরকারি প্রসূতি সেবাকেন্দ্রে চিকিৎসায় চরম অবহেলা ও ব্যবস্থাপনার গাফিলতির অভিযোগে নাঈমা আক্তার লিজা (২১) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পরপরই জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করা হয়েছে।
নিহত লিজা ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের সৌদি প্রবাসী মুজিবুল হকের স্ত্রী। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার সকালে তার প্রসববেদনা শুরু হলে প্রথমে তাকে লস্করহাট এলাকার একটি স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে একজন নার্সের পরামর্শে দ্রুত তাকে শহরের ওই বেসরকারি ক্লিনিকে স্থানান্তর করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, ক্লিনিকে নেওয়ার পর কোনো জটিলতা নিরূপণ ছাড়াই দ্রুত অস্ত্রোপচারের জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং ২২ হাজার টাকার বিনিময়ে তার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়। অস্ত্রোপচারের পরপরই রোগীর শরীরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলেও তা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি বলে দাবি স্বজনদের।
অবস্থার অবনতি হলে শনিবার দুপুরের পর তাকে অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকেরা দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। তবে চট্টগ্রামে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার সময়রেখা
| সময় | ঘটনা |
|---|---|
| শুক্রবার সকাল | প্রসববেদনা শুরু, প্রথমে লস্করহাটে নেওয়া হয় |
| শুক্রবার দুপুর | নার্সের পরামর্শে বেসরকারি ক্লিনিকে স্থানান্তর |
| শুক্রবার রাত | ২২ হাজার টাকায় অস্ত্রোপচার সম্পন্ন |
| অপারেশনের পর | অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু, অবহেলার অভিযোগ |
| শনিবার দুপুর | অবস্থার অবনতি, পরবর্তী হাসপাতালে স্থানান্তর |
| শনিবার বিকেল | চট্টগ্রামে নেওয়ার পরামর্শ প্রদান |
| শনিবার সন্ধ্যা | পথে প্রসূতির মৃত্যু |
| শনিবার রাত | প্রশাসনের অভিযান ও প্রতিষ্ঠান সিলগালা |
পরিবারের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের দাবি, অস্ত্রোপচারের সময় অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। তবে বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।
ঘটনার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শনিবার সন্ধ্যা প্রায় পৌনে সাতটার দিকে জেলা সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের একটি দল ক্লিনিকে অভিযান চালায়। তবে অভিযানের আগেই ক্লিনিকের চিকিৎসক, মালিক ও কর্মীরা স্থান ত্যাগ করেন বলে জানা যায়।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, প্রাথমিক তদন্তে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনের লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিভিল সার্জন আরও জানান, এর আগেও একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ছিল এবং একবার তা সিলগালাও করা হয়েছিল। পুনরায় একই ধরনের গুরুতর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত তদারকির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অবহেলা ও প্রাণহানির ঘটনা আর না ঘটে।
