ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবার প্রত্যাহার: কোনো সংকেত খুঁজে পাচ্ছেন না পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের আকস্মিক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বুধবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে এমন কোনো নিরাপত্তা সংকট নেই যার কারণে বিদেশি কূটনীতিকদের পরিবার সরিয়ে নিতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত আসলে কী বার্তা বা ‘সংকেত’ দিতে চাইছে, তা সরকারের কাছে স্পষ্ট নয়।

নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও উপদেষ্টার ব্যাখ্যা

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট করে বলেন যে, ঢাকায় ভারতীয় মিশনের কর্মকর্তাদের বা তাঁদের পরিবারের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা শঙ্কা বিদ্যমান নেই। ভারত সরকার তাঁদের কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারকে ফেরত নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে তিনি ভারতের ‘নিজস্ব ব্যাপার’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশে বর্তমানে এমন কোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নেই যেখানে বিদেশি প্রতিনিধিরা বিপদে আছেন বলে মনে হতে পারে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, অতীতের যেকোনো নির্বাচনকালীন সময়ের তুলনায় বর্তমানের পরিস্থিতি অনেক বেশি স্থিতিশীল। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা ছোটখাটো সংঘর্ষের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা কূটনীতিকদের পরিবার প্রত্যাহারের মতো বড় সিদ্ধান্তের জন্য পর্যাপ্ত কারণ হতে পারে না।

নিচে ভারতের এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

প্রসঙ্গের বিবরণবাংলাদেশ সরকারের অবস্থান ও মন্তব্য
নিরাপত্তা শঙ্কাএখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা হুমকির তথ্য জানানো হয়নি।
পরিবার প্রত্যাহারএটি ভারতের নিজস্ব সিদ্ধান্ত; এর নেপথ্যে কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাচ্ছে না ঢাকা।
কূটনৈতিক বার্তাএই পদক্ষেপের মাধ্যমে কোনো বিশেষ ‘সংকেত’ বা মেসেজ দেওয়া হচ্ছে কি না তা অস্পষ্ট।
মিশনের নিরাপত্তাহাইকমিশনের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
নির্বাচকালীন পরিবেশঅতীতের তুলনায় বর্তমানে নির্বাচনী সহিংসতা বা সংঘর্ষ অনেক কম।

ব্যর্থতা বনাম সার্বভৌম সিদ্ধান্ত

সরকার কি ভারতীয় কূটনীতিকদের আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, এখানে সফলতা বা ব্যর্থতার কোনো প্রশ্ন নেই। একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে যেকোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তিনি মনে করেন না যে এটি বাংলাদেশ সরকারের কোনো কূটনৈতিক ব্যর্থতা। ভারতীয় হাইকমিশন থেকে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি, তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা (যেমন মিশনের সামনে জমায়েত) নিয়ে তাঁরা সজাগ ছিলেন এবং সরকার তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপত্তা জোরদার করেছে।

উল্লেখ্য যে, শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি’র মৃত্যুর পরবর্তী পরিস্থিতি বা অন্য কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে এই প্রত্যাহারের তুলনা করতে রাজি হননি উপদেষ্টা। তিনি জানান, ভারত যা চেয়েছে তার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে; এরপরও তারা সন্তুষ্ট না হলে বাংলাদেশের কিছু করার নেই।

ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল বাতিল

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে ভারতের জন্য বরাদ্দকৃত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বর্তমান অবস্থাও পরিষ্কার করেন। চট্টগ্রামে ভারতকে যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) দেওয়ার কথা ছিল, তা অনেক আগেই বাতিল করা হয়েছে বলে তিনি জানান। বর্তমানে সেই জমিটি একটি বিশেষায়িত শিল্পের জন্য পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, ঢাকা ভারতের এই পদক্ষেপকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে নিজেদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী।