ব্র্যাকের ‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’: বিরতি কাটিয়ে নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতায় অনেক দক্ষ নারী মাঝপথে পেশাজীবন থেকে ছিটকে পড়েন। কর্মবিরতিতে যাওয়া এই বিপুলসংখ্যক নারী শক্তিকে পুনরায় মূলধারার কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক চালু করেছে অনন্য এক উদ্যোগ— ‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

নারীদের ক্যারিয়ার বিচ্যুতি ও প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা

বিশ্বব্যাপী এবং দেশীয় গবেষণার তথ্য বলছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী পেশাজীবী পারিবারিক ও মাতৃত্বকালীন দায়িত্ব পালনের জন্য চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। তবে আশার কথা হলো, বিরতি নেওয়া নারীদের ৯৮.৫ শতাংশই আবার পেশাজীবনে ফিরতে আগ্রহী। কিন্তু দীর্ঘ বিরতির পর চাকরির বাজারে আবেদন করতে গিয়ে তারা নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। নিয়োগকর্তাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক গ্লানির কারণে অনেক সময় মেধাবী নারীরা আর ফিরতে পারেন না।

ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীর সভায় বলেন, “আমরা সাধারণত স্কুল ড্রপআউট নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু আমাদের সমাজে সাইলেন্ট ‘ক্যারিয়ার ড্রপআউট’ অনেক বেশি, যা মূলত নারীদের ক্ষেত্রেই ঘটে। এই সমস্যার একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবেই আমরা ‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’ শুরু করেছি।”


কেন নারীরা বিরতি নেন এবং কেন ফিরতে চান?

ব্র্যাকের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, নারীদের কর্মজীবন থেকে বিরতি নেওয়ার কারণ এবং পুনরায় ফেরার অনুপ্রেরণাগুলো নিচে সারণিবদ্ধ করা হলো:

বিরতি নেওয়ার প্রধান কারণসমূহহার (%)পুনরায় কাজে ফেরার অনুপ্রেরণাহার (%)
পারিবারিক দায়িত্ব পালন৩৮.৮%পেশাগত উন্নতি ও আকাঙ্ক্ষা৭৬.৫%
মাতৃত্বকালীন দায়িত্ব৩৬.০%অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন৫৬.৫%
বিরূপ কর্মপরিবেশ৮.৫%পরিবারে আর্থিক অবদান রাখা৪২.৭%
সামাজিক চাপ৪.৭%আত্মপরিচয় ও সম্মান৩১.৩%

‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’ কর্মসূচির স্বরূপ

এটি মূলত ছয় মাস মেয়াদী একটি ইন্টার্নশিপ বা রিটার্নশিপ প্রোগ্রাম। এর মাধ্যমে নারীরা ব্র্যাকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজ করার সরাসরি সুযোগ পান। শুধু কাজের সুযোগই নয়, এর অধীনে অংশগ্রহণকারীদের নেতৃত্ব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং এবং আধুনিক পেশাগত দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ব্র্যাক জানায়, এ বছর এই কর্মসূচির জন্য ১,২০০-এর বেশি নারী আবেদন করেছিলেন। কয়েক ধাপের কঠোর বাছাই শেষে ২৪ জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়েছে, যারা বর্তমানে ব্র্যাকে কাজ শুরু করেছেন। গত বছর এই সুযোগ পেয়েছিলেন ১৫ জন নারী। যারা চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হতে পারেননি, তাদের মধ্য থেকেও অত্যন্ত দক্ষ ১২০ জন নারীর তথ্য ব্র্যাক অন্যান্য করপোরেট ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করবে, যাতে তারা নিয়োগের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞ নারীদের অগ্রাধিকার দিতে পারে।

প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে নতুন শুরু

দীর্ঘ বিরতির পর কাজে ফেরার পথে নারীরা যে মানসিক ও সামাজিক বাধার সম্মুখীন হন, তার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারী জাহরুন জান্নাত। চার বছর চাকরির পর মাতৃত্বকালীন বিরতি নিয়েছিলেন তিনি। দুই বছর পর কাজে ফিরতে গিয়ে তিনি কোথাও ডাক পাচ্ছিলেন না। তিনি জানান, অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তারা প্রশ্ন করেন— “বাচ্চা সামলে আপনি কাজ করবেন কীভাবে?” ব্র্যাকের এই উদ্যোগটি তাকে পুনরায় আত্মবিশ্বাসের সাথে পেশাজীবনে ফেরার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে।

ব্র্যাক আরও জানায়, যারা সরাসরি চাকরিতে যোগ দিতে পারছেন না, তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ব্যবসায়িক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মূলত কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনশক্তিকে অপচয় হওয়া থেকে রক্ষা করাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং গত বছরের সফল অংশগ্রহণকারীরা উপস্থিত ছিলেন। তারা একমত পোষণ করেন যে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যদি এ ধরনের রিটার্নশিপ ব্যবস্থা থাকে, তবে দেশের অর্থনীতিতে নারীদের অবদান আরও টেকসই হবে।