ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনের পর অভ্যুত্থানচেষ্টা চালানোর অভিযোগে আজ সোমবার দেশটির সুপ্রিম কোর্টে হাজির হচ্ছেন। ডানপন্থী এই নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ক্ষমতায় থাকার জন্য নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিলেন।
ব্রাসিলিয়া থেকে এএফপি জানিয়েছে, ৭০ বছর বয়সী বলসোনারো ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাকে একটি ‘অপরাধ চক্রের’ নেতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। সেই চক্রের উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার শপথ অনুষ্ঠান ঠেকানো।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর পূর্ণ সমর্থন না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এমনকি লুলা, তার ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেরালদো আলকমিন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেক্সান্দ্রে দে মোরায়েসকে হত্যার ষড়যন্ত্রের বিষয়েও বলসোনারোর জানা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বর্তমানে বলসোনারো প্রার্থী হওয়ার অধিকার হারিয়েছেন। তবে তিনি এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।
এই মামলায় বলসোনারোর পাশাপাশি আরও সাতজন সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী অভিযুক্ত। দোষী প্রমাণিত হলে তাদের সর্বোচ্চ ৪০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
‘সত্যের মুখোমুখি’
যদিও আদালতে চুপ থাকার অধিকার রয়েছে, তবে বলসোনারো সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি ‘কোনো সমস্যা ছাড়াই’ সব প্রশ্নের উত্তর দেবেন। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ‘অভ্যুত্থান নিয়ে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ পাওয়া ভালো। এটা সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত।’
ব্রাসিলিয়ার সুপ্রিম কোর্ট ভবনে বলসোনারো সাক্ষ্য দেবেন। এই একই ভবনে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তার সমর্থকরা হামলা চালিয়েছিল এবং সেনাবাহিনীকে লুলার সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছিল।
মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ সপ্তাহব্যাপী চলবে এবং তা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। সাক্ষীদের তালিকায় বলসোনারো রয়েছেন ষষ্ঠ অবস্থানে। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি মঙ্গলবার বা বুধবার আদালতে সাক্ষ্য দেবেন।
ঘনিষ্ঠজনদের মুখোমুখি
মামলার এই বিচারে বলসোনারোর পুরনো সহযোগীদের সঙ্গেও আবার দেখা হবে। অভিযুক্ত সাতজনের প্রত্যেককেই সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বলসোনারোর সাবেক সহকারী মাউরো সিড, যিনি রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হয়ে এখন সাবেক নেতার সমর্থকদের কাছে ‘বিশ্বাসভঙ্গকারী’।
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, সিডের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই অভ্যুত্থানচেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন চারজন সাবেক মন্ত্রী, ব্রাজিলের সাবেক নৌবাহিনী প্রধান ও গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান।
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বলসোনারো শুধু সরকারি কৌঁসুলি ও নিজের আইনজীবীদেরই নয়, বরং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেক্সান্দ্রে দে মোরায়েসেরও প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন, যাকে তিনি আগেও ‘একনায়ক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
‘ইতিহাসের বিচার’
গেটুলিও ভারগাস ফাউন্ডেশনের অপরাধ বিশেষজ্ঞ রজেরিও তাফারেলো জানিয়েছেন, এই বিচারপ্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুত এগোলেও রায়ের জন্য এখনও সময় লাগবে। কারণ নতুন সাক্ষী ডাকাও হতে পারে। তিনি বলেন, ‘এই ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছিল। ফলে আইনি আলোচনাও জটিল হবে।’
স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, গত সপ্তাহান্তে সাও পাওলো রাজ্যের গভর্নর তারসিসিও দে ফ্রেইতাসের বাসভবনে আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষ্যের প্রস্তুতি নিয়েছেন বলসোনারো।
গভর্নর দে ফ্রেইতাস প্রাথমিক পর্যায়ে বলসোনারোর পক্ষেই সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে দুই সাবেক সেনাপ্রধান নিশ্চিত করেছেন, বলসোনারো একটি বৈঠকে ‘অবরুদ্ধ অবস্থা’ জারির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়া হতো।
‘ব্রাজিলের ইতিহাস লেখা হচ্ছে,’ মন্তব্য করেন কাসা পলিটিকা থিঙ্ক ট্যাংকের প্রধান মার্সিও কোইম্ব্রা। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভ্যুত্থানচেষ্টার মামলায় এটিই প্রথম বিচারপ্রক্রিয়া।
