ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে বন্ধুসহ বেড়াতে গিয়ে ‘কিশোর গ্যাং’ বা ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়া আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওনের (২৬) নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজের দুই দিন পর শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাত পৌনে ১১টার দিকে নগরীর জয়নুল আবেদিন উদ্যান সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদের চর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে সহপাঠী ও স্বজনদের মধ্যে শোকের মায়া ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিবরন ও নৃশংসতা
নিহত নুরুল্লাহ শাওন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার চর জাকালিয়া গ্রামের মৃত রফিকুল ইসলামের সন্তান এবং আনন্দ মোহন কলেজের রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত বুধবার বিকেলে তিনি তাঁর বন্ধু মঞ্জুরুল আহসান রিয়াদসহ ব্রহ্মপুত্র নদের ওপাড়ে চর এলাকায় ঘুরতে যান। সন্ধ্যা নামার মুখে প্রায় ৭-১০ জনের একটি কিশোর ছিনতাইকারী দল তাঁদের পথরোধ করে।
ছিনতাইকারীরা তাঁদের কাছে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন দাবি করলে শাওন ও রিয়াদ জানান যে, তাঁদের কাছে নৌকা ভাড়া ছাড়া অতিরিক্ত কোনো অর্থ নেই। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা তাঁদের ওপর চড়াও হয় এবং মারধর শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে দুই বন্ধু দুই দিকে দৌড় দিলে ছিনতাইকারীরাও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে তাঁদের পিছু নেয়। রিয়াদ কোনোমতে সাঁতরে নদ পার হতে পারলেও শাওন নিঁখোজ হয়ে যান।
নিচে ঘটনার সংক্ষিপ্ত ঘটনাক্রম ও তথ্যের একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহত শিক্ষার্থীর নাম | নুরুল্লাহ শাওন (২৬), রসায়ন বিভাগ, ৩য় বর্ষ। |
| ঘটনাস্থল | ব্রহ্মপুত্র নদের চর, জয়নুল আবেদিন উদ্যান এলাকা। |
| ঘটনার সময় | বুধবার বিকেল ও সন্ধ্যা (১৮ ফেব্রুয়ারি)। |
| মরদেহ উদ্ধার | শুক্রবার রাত পৌনে ১১টা (২০ ফেব্রুয়ারি)। |
| অভিযুক্ত | ৭-১০ জনের কিশোর ছিনতাইকারী দল (বয়স ১৩-১৬)। |
| মামলার বর্তমান অবস্থা | একজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে; অন্যদের খোঁজে অভিযান চলছে। |
উদ্ধার অভিযান ও তদন্ত প্রক্রিয়া
বৃহস্পতিবার সকালে নদের পাড়ে শাওনের ব্যাগ ও জুতা পাওয়া গেলে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল দিনভর তল্লাশি চালায়। তবে সেসময় কোনো হদিস মেলেনি। অবশেষে শুক্রবার রাতে নৌকার মাঝিরা নদের চরে একটি মরদেহ আটকে থাকতে দেখে ৯৯৯-এ কল দিলে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব জানান, সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
সহপাঠীদের ক্ষোভ ও বিচার দাবি
শাওনের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁর সহপাঠীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁদের অভিযোগ, ঘটনার পর একজনকে হাতেনাতে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলেও বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ যথেষ্ট তৎপরতা দেখায়নি। শাওনের বন্ধু শোয়েব আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা আসামিদের নাম-ঠিকানা দেওয়ার পরও পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়নি। আমরা এই পরিকল্পিত হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং জড়িতদের ফাঁসি চাই।”
ইতিমধ্যে শাওনের মা সাহিদা বেগম বাদী হয়ে সাতজনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত কিশোরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্য আসামিদের ধরতে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। ময়মনসিংহের মতো শান্ত শহরে পর্যটন কেন্দ্রে কিশোর গ্যাংয়ের এমন দৌরাত্ম্য সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
