ব্যারিস্টার আরমানের গুমজীবনের রহস্য উন্মোচন

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রবিবার (৮ মার্চ) ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমানের দীর্ঘ আট বছরের আত্মগোপনের তথ্য সামনে আসে। বিচারিক প্যানেল, যা নেতৃত্ব দেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, ট্রাইব্যুনালে তার জেরার সময় আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো নিশ্চিত করেন যে, কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাঁকে গুম করেনি।

প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, শাইখ মাহদী এবং এবিএম সুলতান মাহমুদ। জেরার সময় আইনজীবী টিটো ব্যারিস্টার আরমানকে বলেন, “আপনি স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন। আপনার লেখা ‘আয়নাঘরের সাক্ষী, গুমজীবনের আট বছর’ বইয়ে বর্ণিত তথ্য মিথ্যা।” ব্যারিস্টার আরমান তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এসব সত্য নয়।”

জেরার সময় তিনি জানান, মামলার আলামত হিসেবে তল্লাশি করা জিনিসপত্র—ঘাড়ের গামছা, পরনের লুঙ্গি ও টি-শার্ট—সংরক্ষণ করা হয়নি। আরমান জানিয়েছেন, তিনি নিজে এগুলো ধ্বংস করেছেন। আইনজীবী টিটো প্রশ্ন করলে, তিনি স্বীকার করেছেন, “হ্যাঁ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এগুলো ধ্বংস করেছি।”

ট্রাইব্যুনালে ব্যারিস্টার আরমানের গুমজীবন নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। ভিডিওর ১৯ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে দেখা যায় তিনি লুঙ্গি-টি-শার্ট ও ঘাড়ে গামছা পরেছেন। আরমান বলেন, এটি প্রামাণ্যচিত্রের জন্য নয়, ফুটেজটি মূল সিসিটিভি থেকে নেওয়া। কিন্তু আইনজীবী টিটো মন্তব্য করেন, “প্রামাণ্যচিত্র তৈরির উদ্দেশ্যেই আপনি এগুলো পরেছিলেন।” ব্যারিস্টার আরমান তা অস্বীকার করেন।

এরপর লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেমসহ সাত আসামির পক্ষে আইনজীবী তাবারক হোসেন জেরার আবেদন করেন। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আপত্তি জানান। ট্রাইব্যুনাল আগামী ১০ মার্চ জেরার দিন নির্ধারণ করেছেন।

সকালে ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে ১০ জন আসামি ট্রাইব্যুনালে হাজির হন। তাদের নাম ও পদবী নিচের টেবিলে দেওয়া হলো:

নামপদবী/প্রসঙ্গ
মো. জাহাঙ্গীর আলমর‍্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল
তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ারব্রিগেডিয়ার জেনারেল
মো. কামরুল হাসানব্রিগেডিয়ার জেনারেল
মো. মাহাবুব আলমব্রিগেডিয়ার জেনারেল
কর্নেল কেএম আজাদকর্নেল
কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেনকর্নেল
আনোয়ার লতিফ খানকর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত)
মো. মশিউর রহমানর‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক
সাইফুল ইসলাম সুমনলেফটেন্যান্ট কর্নেল
মো. সারওয়ার বিন কাশেমলেফটেন্যান্ট কর্নেল

পলাতক আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন: মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, র‍্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন, ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ, এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. খায়রুল ইসলাম।

জেরার এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংক্রান্ত মামলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ যাচাই এবং সাক্ষীদের সত্যনিষ্ঠা নিশ্চিত করার একটি মূল ধাপ। শুরুর প্রারম্ভ থেকে আজ পর্যন্ত ব্যারিস্টার আরমানের আত্মগোপনের ঘটনা ও তার সাক্ষ্য আন্তর্জাতিক আদালতের নজরে বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছে।

এই ধাপে আন্তর্জাতিক আদালত প্রমাণ সংগ্রহ এবং সাক্ষীদের সততা যাচাই করার মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলা নিয়ে ন্যায়বিচারের পথ সুগম করছে।