ব্যাংক খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রণোদনা বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জন করতে ব্যর্থ হলেও যদি পরিচালন মুনাফা বজায় থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কর্মীদের প্রণোদনা বোনাস প্রদান করা যাবে। এর ফলে আর্থিকভাবে চাপের মধ্যে থাকা বহু ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বোনাস পাওয়ার সুযোগ আবারও উন্মুক্ত হলো।
মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল জারি করা এক সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে এ নির্দেশনা পাঠায়। সার্কুলারে বলা হয়, ব্যাংকের মূলধনে ঘাটতি থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট আর্থিক শর্ত পূরণ করা হলে কর্মীদের জন্য বোনাস অনুমোদন করা সম্ভব হবে।
নতুন নীতিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যেসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি আগের বছরের তুলনায় বাড়েনি, তারা এই সুবিধার আওতায় আসতে পারবে। অর্থাৎ, মূলধন ঘাটতি থাকলেও যদি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তার আর্থিক অবস্থাকে আরও অবনতির দিকে না নিয়ে যায়, তবে কর্মীদের বোনাস প্রদানে বাধা থাকবে না। এছাড়া, যেসব ব্যাংকের অতিরিক্ত সময়সুবিধা বা আর্থিক ছাড়ের প্রয়োজন নেই, তারাও নতুন নিয়মের আওতায় বোনাস দিতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সর্বোচ্চ এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ প্রণোদনা বোনাস অনুমোদন করতে পারবে। এর বেশি বোনাস দেওয়ার অনুমতি নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্য হলো আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা।
আগের ও বর্তমান নির্দেশনার তুলনা
| বিষয় | আগের নির্দেশনা | নতুন নির্দেশনা |
|---|---|---|
| নিট মুনাফা না থাকলে বোনাস | অনুমোদিত নয় | পরিচালন মুনাফা থাকলে অনুমোদিত |
| মূলধন ঘাটতি | বোনাস নিষিদ্ধ | শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত |
| প্রভিশন ঘাটতি | কঠোর সীমাবদ্ধতা | নির্দিষ্ট শর্তে শিথিল |
| সর্বোচ্চ বোনাস | সীমিত | এক মাসের মূল বেতন পর্যন্ত |
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে জারি করা নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, যেসব ব্যাংক নিট মুনাফা করতে ব্যর্থ হবে, তারা কর্মীদের কোনো ধরনের প্রণোদনা বোনাস দিতে পারবে না। একই সঙ্গে মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর ওপরও বোনাস প্রদানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলে দেশের বেশ কয়েকটি দুর্বল আর্থিক অবস্থার ব্যাংকে প্রচলিত বছরশেষের উৎসাহ বোনাস বন্ধ হয়ে যায়।
ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনেক ব্যাংক আর্থিক বছর শেষে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহিত করতে বিশেষ বোনাস দিয়ে আসছিল। তবে গত ডিসেম্বরের কড়াকড়ির কারণে দুর্বল ব্যাংকগুলোর কর্মীরা বোনাস থেকে বঞ্চিত হন, যা কর্মীদের মনোবল ও কর্মোদ্যমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
এ পরিস্থিতিতে চলতি মাসে ব্যাংকারদের সংগঠন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিধিনিষেধ শিথিলের অনুরোধ জানায়। তাদের যুক্তি ছিল, ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মধ্যে দক্ষ জনবল ধরে রাখতে এবং কর্মীদের উৎসাহ বজায় রাখতে নমনীয় বোনাস নীতি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, নতুন সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মোদ্যম বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখা এবং ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা। তবে ডিসেম্বর মাসে জারি করা সার্কুলারের অন্যান্য নির্দেশনা আগের মতোই বহাল থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ব্যাংক কর্মীদের জন্য স্বস্তির বার্তা হলেও ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক নজরদারি প্রয়োজন। কারণ, বোনাস প্রদানের সুযোগ বাড়লেও দুর্বল আর্থিক ভিত্তির ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।
