,

ব্যাংক খাতের তদারকি সংস্কারে ১,২৭৬ কোটি টাকার উদ্যোগ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের তদারকি ব্যবস্থা আধুনিক ও শক্তিশালী করতে ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার একটি পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, তারল্য ও মূলধনের চাপ এবং পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার কারণে আর্থিক স্থিতিশীলতায় যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (এফএসএসপি-২) নামের প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও প্রয়োজন হলে ব্যাংক রেজল্যুশনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল ১০টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে একনেকের সভা হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন ও সংশোধিত মিলিয়ে মোট ১৫টি প্রকল্প এ সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ১,২৬১ কোটি টাকা

প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। মোট ব্যয়ের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) দেবে ১ হাজার ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সরকারের সরাসরি অর্থায়ন থাকছে না।

পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প নথিতে ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা।

নথি অনুযায়ী, কয়েকটি ব্যাংক, বিশেষ করে কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী ব্যাংক, তারল্য ও মূলধনের সংকটের চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপর কার্যকর নজরদারি এবং সংকট তৈরি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় জোর

এফএসএসপি-২-এর অন্যতম লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো। প্রকল্পের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন করা এবং পরিস্থিতি গুরুতর হলে ব্যাংক রেজল্যুশনের ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কোনো ব্যাংক আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। আমানতকারী, ঋণগ্রহীতা এবং আর্থিক ব্যবস্থার অন্যান্য অংশও এর প্রভাবে পড়তে পারে। তাই সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রকের প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামোকে শক্তিশালী করার ওপর প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা উন্নয়নও প্রকল্পের আওতাভুক্ত। একই সঙ্গে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ট্রাস্ট ফান্ড শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো ব্যাংক তার দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া যাতে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়, সেই সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

প্রযুক্তি খাতে ব্যয় হবে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি

প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ করা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে। মোট প্রকল্পের মূলধন ব্যয়ের পরিমাণ ১ হাজার ৭৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

এর মধ্যে আইসিটি সরঞ্জাম কেনায় ৭১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা, কম্পিউটার সফটওয়্যারে ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং ডেটাবেজ উন্নয়নে ৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা।

ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তদারকির ক্ষেত্রেও দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। একটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন, ঝুঁকির মাত্রা বা সম্ভাব্য দুর্বলতা সম্পর্কে সময়মতো তথ্য পাওয়া গেলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়।

কিন্তু প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, বর্তমান আইসিটি অবকাঠামো ও সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি কর্তৃপক্ষের ঝুঁকি শনাক্ত ও মোকাবিলার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। সাইবার হামলা, আন্তঃদেশীয় আর্থিক ঝুঁকি এবং অন্যান্য নতুন ধরনের হুমকি মোকাবিলায় এসব সীমাবদ্ধতা বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

আধুনিক প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। এর সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন উৎসের তথ্যকে সমন্বিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রশিক্ষণ পাবেন ৩,৫৬৫ জন

প্রকল্পে প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

এর মধ্যে আইডিএ দেবে ৬৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক দেবে ৩ কোটি টাকা। আধুনিক ব্যাংক তদারকি, তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির জন্য সংশ্লিষ্ট জনবলের দক্ষতা বাড়ানোই এ অংশের উদ্দেশ্য।

এ ছাড়া ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শক সেবার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২৯ কোটি ১০ লাখ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শকের জন্য ৬৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।

সংকটের আগেই ঝুঁকি শনাক্তের লক্ষ্য

প্রকল্পটির বৃহত্তর উদ্দেশ্য হলো ব্যাংক তদারকি ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর করা, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা বড় সংকটে পরিণত হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করা যায়। খেলাপি ঋণ, মূলধনের ঘাটতি, তারল্য চাপ কিংবা সুশাসনের দুর্বলতার মতো ঝুঁকি পর্যবেক্ষণে উন্নত তথ্যব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যাংক রেজল্যুশনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠান গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়লে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে এবং বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থায় ঝুঁকি ছড়িয়ে পড়া সীমিত রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল মূলধন, তারল্য সংকট, সুশাসনের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব বাস্তবতার মধ্যে এফএসএসপি-২ শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তি আধুনিকায়নের প্রকল্প নয়। ব্যাংক তদারকি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান মোকাবিলা এবং আমানতকারীদের সুরক্ষার সামগ্রিক কাঠামো উন্নত করাই এর মূল লক্ষ্য।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, একনেকের বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য নির্ধারিত ১৫টি প্রকল্পের মধ্যে স্বাস্থ্য, কৃষি, পানি সম্পদ, স্থানীয় সরকার, সড়ক, ভূমি, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ ও শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের প্রকল্প রয়েছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।