ব্যবসা পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সহায়তা

সঙ্কটে থাকা ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা পুনরুদ্ধার এবং শিল্পখাত পুনরায় সচল করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি একটি নতুন নীতিগত সহায়তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। গত রবিবার জারি হওয়া সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বিভিন্ন ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডাউন পেমেন্ট শিথিল এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা এই পদক্ষেপকে সংকটাপন্ন শিল্পখাত পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে ব্যাংকাররা সতর্ক করেছেন যে, কিছু ঋণগ্রহীতা এই নমনীয়তার সুযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করতে পারে।

সংশোধিত নীতিমালার মূল বৈশিষ্ট্য

বিষয়বিস্তারিত
ডাউন পেমেন্ট শর্তপূর্বনির্ধারিত পরিমাণের ৫০% তাৎক্ষণিক পরিশোধ, বাকি ৫০% ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ
সময়সীমা বৃদ্ধিবৈধ কারণে প্রয়োগ সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ ৩ মাস বাড়ানো যাবে
সুদ ও শর্তবিদ্যমান নীতিমালা, ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্ক ও প্রযোজ্য নির্দেশনার আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ব্যাংকগুলোকে
প্রযোজ্য ক্ষেত্রঝুঁকিপূর্ণ বা সংকটে থাকা ঋণগ্রহীতা শিল্প ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান

সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, যোগ্য ঋণগ্রহীতারা কিস্তিতে ডাউন পেমেন্ট পরিশোধের সুবিধা পাবেন। ব্যাংকগুলোকে সুদ এবং অন্যান্য শর্তাবলী সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

প্রেক্ষাপট ও কমিটি কার্যক্রম

গত বছরের জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের নির্বাহী পরিচালক। কমিটির লক্ষ্য ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা করপোরেট ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা। কমিটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে, যেখানে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান, অর্থায়নকারী ব্যাংক এবং কমিটির প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই কার্যক্রম গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত হয়।

এর আগে, ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমন্বিত বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিল নীতি ঘোষণা করে। নীতির উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ঋণগ্রহীতাদের সহায়তা করা।

কার্যকরী প্রভাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম নয় মাসে প্রায় ৩০০টি কোম্পানি ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের জন্য আবেদন করে, যার পরিমাণ প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নমনীয়তা সংকটাপন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে পারে। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে।”

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান উল্লেখ করেছেন, “নির্বাচিত সরকার গঠনের পর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও সেবা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে এই সিদ্ধান্ত একটি স্বস্তির সুযোগ তৈরি করবে। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও বলেন, এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন করা জরুরি।

উপসংহার

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালার মাধ্যমে ব্যাংক ও সরকারী সহযোগিতার মধ্যে ঋণগ্রহীতারা নতুন উদ্যমে ব্যবসা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছেন। ডাউন পেমেন্ট শিথিল এবং সময়সীমা বৃদ্ধির এই পদক্ষেপ দেশের শিল্পখাতকে সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে সহায়ক হবে। ঋণগ্রহীতাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, যা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক পরিবেশ পুনরায় সচল হতে পারে।