বরগুনার বেতাগী উপজেলায় দীর্ঘ সময় পরিত্যক্ত থাকার পর একটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার বুড়া মজুমদার ইউনিয়নে অবস্থিত দলীয় কার্যালয়টির তালা ভেঙে সেখানে প্রবেশ করেন ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। গত শুক্রবার দুপুরের এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মূলত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই এই কার্যালয়টি জনশূন্য ও তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল।
ঘটনার বিবরণ ও ভিডিওর সূত্রপাত
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, শুক্রবার দুপুরে উপজেলার বদনীখালী এলাকায় অবস্থিত বুড়া মজুমদার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী জড়ো হন। তাঁরা হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে কার্যালয়টির তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। কার্যালয়ে প্রবেশের পর তাঁরা সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ছবি পুনরায় স্থাপন করেন। এরপর কার্যালয়ের বাইরে দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং নতুন করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দেন।
এই পুরো ঘটনার স্থিরচিত্র ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হলে তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওতে নেতা-কর্মীদের উচ্ছ্বসিত কর্মকাণ্ড ও স্লোগান দিতে দেখা গেছে, যা গত কয়েকমাস ধরে আত্মগোপনে থাকা নেতা-কর্মীদের পুনরুত্থানের সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ধারাবাহিক ঘটনাক্রম ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বেতাগী উপজেলায় দলীয় কার্যালয় দখলের এটিই প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও গত সোমবার বেতাগী পৌর মার্কেট এলাকায় একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। নিচে বেতাগীতে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলির একটি সংক্ষিপ্ত সারণি দেওয়া হলো:
| সময়কাল | স্থান | ঘটনার ধরণ | বর্তমান পরিস্থিতি |
| ৫ আগস্ট ২০২৪ | সমগ্র বেতাগী উপজেলা | গণ-অভ্যুত্থানের পর কার্যালয় ভাঙচুর ও তালাবদ্ধ করা হয়। | কার্যালয়গুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। |
| গত সোমবার | বেতাগী পৌর মার্কেট | ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তালা ভেঙে কার্যালয়ে ছবি স্থাপন করেন। | কয়েক ঘণ্টা পর উত্তেজিত জনতা ছবি নামিয়ে পুড়িয়ে দেয়। |
| গত শুক্রবার | বদনীখালী এলাকা | বুড়া মজুমদার ইউনিয়ন কার্যালয় ভেঙে পুনরায় ছবি ও সাইনবোর্ড স্থাপন। | এলাকায় চাপা উত্তেজনা ও পুলিশি নজরদারি। |
| ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | বেতাগী উপজেলা সদর | ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নেতা-কর্মীদের প্রকাশ্যে আগমন। | রাজনৈতিক মেরুকরণ ও নতুন করে সক্রিয় হওয়া। |
স্থানীয় প্রভাব ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর বরগুনার বেতাগী উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সংগঠনের কার্যালয়গুলো জনরোষের মুখে পড়েছিল। এর পর থেকে প্রায় সব স্তরের নেতা-কর্মী এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। তবে দীর্ঘ বিরতির পর, বিশেষ করে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে। নির্বাচনী আবহে অনেক নেতা-কর্মী পুনরায় এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন এবং নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনর্গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সচেতন মহলের মতে, দলীয় কার্যালয় দখল এবং পুনরায় ছবি টাঙানোর এই প্রচেষ্টা এলাকায় পাল্টা সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে গত সোমবারের ঘটনার পর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছাত্র-জনতা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে নতুন করে আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বেতাগীতে আওয়ামী লীগের এই সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা স্থানীয় রাজনীতির মাঠে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এই ধরনের পাল্টাপাল্টি কর্মকাণ্ডের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের কঠোর তদারকি ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে স্থানীয় জনজীবন বিঘ্নিত হতে পারে।
