বিশ্বের ১৪ দেশে মাঠ মাতাচ্ছে রাজশাহীর ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্যাট

বাংলাদেশের ক্রীড়াশিল্পে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন রাজশাহীর সন্তান হুসাইন মোহাম্মদ আফতাব শাহীন। তাঁর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত ‘এমকেএস স্পোর্টস’ এখন কেবল স্থানীয় কোনো কারখানা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) স্বীকৃত এক বিশ্বমানের ব্র্যান্ড। রাজশাহী নগরীর বারো রাস্তার মোড় এলাকায় গড়ে ওঠা এই কারখানাটি এখন বিশ্বের ১৪টি দেশে উন্নত মানের ক্রিকেট ব্যাট রপ্তানি করছে। মেধা, শ্রম আর সৃজনশীলতার সমন্বয়ে শাহীন প্রমাণ করেছেন যে, যথাযথ কারিগরি জ্ঞান থাকলে বাংলাদেশেই বিশ্বমানের ক্রিকেট সরঞ্জাম তৈরি সম্ভব।

‘ব্যাট-ডক্টর’ থেকে সফল উদ্যোক্তা

এমকেএস স্পোর্টসের নেপথ্য কারিগর হুসাইন মোহাম্মদ আফতাব শাহীনের এই যাত্রা সহজ ছিল না। ২০০৪ সাল থেকে তিনি ব্যাটের গঠনশৈলী ও প্রকৌশলগত দিক নিয়ে নিবিড় গবেষণা শুরু করেন। তাঁর দক্ষতা এতটাই নিখুঁত যে, শচীন টেন্ডুলকার ও বিরাট কোহলির মতো বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটারদের ব্যাটের ভারসাম্য ঠিক করার কাজও করেছেন তিনি। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফসল হিসেবে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এমকেএস স্পোর্টস। এই উদ্যোগে শাহীনের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়েছেন জাতীয় দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ইমরুল কায়েস ও অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। বর্তমানে এই কারখানায় ৬০ জনেরও বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

দেশীয় বাজারের সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক প্রভাব

বাংলাদেশে প্রতি বছর পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে প্রায় ১০-১২ লাখ ক্রিকেট ব্যাট আমদানি করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা। এমকেএস স্পোর্টসের মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। উন্নত মানের উইলো ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি এই ব্যাটগুলো এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেটারদের অন্যতম পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

এক নজরে এমকেএস স্পোর্টস ও বাংলাদেশের ব্যাট বাজার:

বিষয়ের বিবরণবিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান
প্রতিষ্ঠানের অবস্থানবারো রাস্তার মোড়, রাজশাহী নগরী।
মূল উদ্যোক্তাহুসাইন মোহাম্মদ আফতাব শাহীন।
অংশীদার ক্রিকেটারইমরুল কায়েস ও মেহেদী হাসান মিরাজ।
স্বীকৃতিআইসিসি (ICC) অনুমোদিত প্রস্তুতকারক।
রপ্তানি গন্তব্যইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের ১৪টি দেশ।
বাংলাদেশের বাজারের আকারবার্ষিক ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা।
কর্মসংস্থান৬০ জনের বেশি দক্ষ কর্মী।

বিশ্বমঞ্চে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’

এক সময় বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা বিদেশি ব্র্যান্ডের ব্যাটের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন চিত্র বদলেছে। এমকেএস স্পোর্টসের তৈরি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা ব্যাট নিয়ে এখন মাঠ মাতাচ্ছেন দেশি-বিদেশি তারকা ক্রিকেটাররা। ব্যাটের হ্যান্ডেল, ব্যালেন্স এবং পাঞ্চ—প্রতিটি বিষয় শাহীনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নিশ্চিত করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে পাল্লা দিতে সক্ষম। এটি কেবল একটি ব্যবসা নয়, বরং বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) সক্ষমতার এক উজ্জ্বল জয়গান।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও উপসংহার

রাজশাহীর এমকেএস স্পোর্টস দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। ক্রীড়াশ্লিষ্ট এই শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে ক্রিকেট সরঞ্জাম রপ্তানির একটি বড় কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া সরঞ্জাম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে—এমনটিই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।