রাজধানীর মিন্টো রোডে সরকারি উচ্চপদস্থ সচিবদের জন্য তৈরি আবাসনগুলোর আধুনিক ও চাকচিক্যময় সুযোগ-সুবিধা যেকোনো পাঁচ তারকা হোটেলকেও হার মানাবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে তিনি রাষ্ট্রের এই ব্যয়বহুল জীবনযাত্রার তীব্র সমালোচনা করেন। হোসেন জিল্লুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, জনগণের অর্থে এই বিপুল বিলাসিতার জবাবদিহি কে নিশ্চিত করবে?
Table of Contents
রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও সুশাসনের সংকট
হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার চরম অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা কয়েক দফায় বাড়ানো হলেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হারে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বর্তমানে তিনটি বড় ধরনের অদক্ষতা জেঁকে বসেছে:
১. তীব্র অর্থায়ন-সংকট।
২. সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব।
৩. ক্ষমতাবানদের ‘অহমিকা’ প্রদর্শনের জন্য বড় বড় অকার্যকর প্রকল্প গ্রহণ।
রাষ্ট্রীয় অদক্ষতা ও বর্তমান পরিস্থিতির চিত্র:
| আলোচনার ক্ষেত্র | পর্যালোচিত সমস্যা ও উদাহরণ |
| বিলাসবহুল আবাসন | মিন্টো রোডের সচিব ফ্ল্যাটগুলো আন্তর্জাতিক মানের হোটেলের মতো ব্যয়বহুল। |
| অকার্যকর মেগা প্রজেক্ট | অনেক আইসিটি পার্ক এখন ব্যবহারের অভাবে কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। |
| সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্বচ্ছতা | বিমানের পরিচালনা পর্ষদে হুট করে ৩ জনকে নিয়োগের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। |
| ডিজিটাল বৈষম্য | কর রিটার্ন ও অন্যান্য সেবা আংশিক ডিজিটাল হলেও তা এখনো অত্যন্ত জটিল ও কাগজনির্ভর। |
নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়
সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সরকার ইতিহাসের সেরা নির্বাচনের কথা বললেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, সঠিক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি না হলে এটি ইতিহাসের অন্যতম প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে পরিণত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রশাসন এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যা সাধারণত নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের নেওয়ার কথা, যা তাঁদের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যর্থতা
নীতি সংলাপে বক্তারা একমত হন যে, সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো সুফল পৌঁছায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য সায়মা হক বিদিশা বলেন, কেবল ডিজিটাল সিস্টেম চালু করলেই হবে না, মানুষের ডিজিটাল সাক্ষরতা না বাড়লে দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ এমপি-মন্ত্রীদের জন্য ‘ট্যাক্স-ফ্রি’ গাড়ি ও অন্যান্য অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপনের মতে, এমপিদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো যেতে পারে যদি তাঁরা এটাকে ব্যবসার হাতিয়ার না করে পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।
উপসংহার
সংলাপের মূল নির্যাস ছিল—রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। প্রকল্পের নামে অহমিকা প্রদর্শন এবং আমলাতন্ত্রের জন্য বিলাসবহুল পরিবেশ তৈরি সাধারণ মানুষের সাথে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং প্রতিটি খাতে দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
