বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে বড় লাফ

এশিয়ার বাজারে আজ সোমবার লেনদেনের শুরুতেই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা গেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নির্ধারিত দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা স্থগিত হওয়ার খবরটি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাজার পরিস্থিতির পরিসংখ্যান

আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭.৭০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই (WTI) ক্রুডের দাম ২.১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ৯৬.৪০ ডলারে। উল্লেখ্য যে, গত সপ্তাহে শান্তি আলোচনার ইতিবাচক আবহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমে এসেছিল, যা এখন ১০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

নিচে জ্বালানি তেলের বর্তমান ও পূর্ববর্তী মূল্যের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

তেলের ধরণপূর্ববর্তী মূল্য (ব্যারেলপ্রতি)বর্তমান মূল্য (ব্যারেলপ্রতি)শতাংশ বৃদ্ধি
ব্রেন্ট ক্রুড (Brent Crude)৯০ ডলারের নিচে১০৭.৭০ ডলার২.২% (আজ)
ডব্লিউটিআই (WTI) ক্রুড৯৪.৪০ ডলার (প্রায়)৯৬.৪০ ডলার২.১% (আজ)

আলোচনার অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার ঘোষণা করেন যে, ইরানের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে প্রতিনিধিদল পাঠানোর পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা ওয়াশিংটন বাতিল করেছে। ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দাবি করেন, তেহরানের নেতৃত্ব পর্যায়ে তীব্র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। তার মতে, আলোচনার জন্য প্রতিনিধিদল পাঠানো সময়ের অপচয় এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন যে, তারা আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও নৌযান চলাচল নিরাপদ করার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইরানের পক্ষ থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি ও সরবরাহ সংকট

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) তথ্যমতে, সংঘাত শুরুর আগে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২৯টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে গত শনিবার মাত্র ১৯টি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করেছে, যা সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের ধস নামার ইঙ্গিত দেয়।

তেলের দাম বৃদ্ধির বহুমুখী প্রভাব

জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর প্রভাবগুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

  • পরিবহন ও কৃষি খাত: জ্বালানির দাম বাড়লে সরাসরি বাস, ট্রাক ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি পায়। কৃষিক্ষেত্রে সেচ কাজের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

  • পণ্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি: উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। ফলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি তীব্র আকার ধারণ করে।

  • সামষ্টিক অর্থনীতি: উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হয় এবং জাতীয় বাজেটে ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।