বিদেশের স্বপ্ন যখন দুঃস্বপ্ন: কানাডা প্রবাসী শিক্ষার্থীর রূঢ় বাস্তবতার গল্প

উন্নত জীবন, স্বচ্ছলতা আর সোনালী ভবিষ্যতের আশায় প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী সুদূর কানাডায় পাড়ি জমান। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার ও রূঢ় বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছেন এক ভারতীয় শিক্ষার্থী। জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘রেডিট’-এ করা তাঁর একটি পোস্ট বর্তমানে ভাইরাল, যেখানে তিনি লিখেছেন— ‘আমি কানাডায় এসে আফসোস করছি’। তাঁর এই দীর্ঘ বার্তায় ফুটে উঠেছে আবাসন সংকট, নিম্নমানের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রতি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শোষণের এক করুণ আখ্যান।

ওই শিক্ষার্থী সতর্ক করে বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশের তরুণদের কাছে পশ্চিমা বিশ্ব যে উন্নত জীবনের স্বপ্ন বিক্রি করে, তা আসলে একটি বড় ধরনের ‘বিভ্রম’। তাঁর মতে, কানাডার সরকার এবং মধ্যম সারির কলেজগুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্রেফ অর্থ আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে। উচ্চমাত্রার টিউশন ফি দিয়েও শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “শিক্ষকদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই, সিলেবাস যুগের সাথে তাল মেলাতে পারছে না। ফলাফলস্বরূপ, এই ডিগ্রি নিয়ে যখন কেউ চাকরির বাজারে যায়, তখন মালিকরা সেই ডিপ্লোমাকে কোনো পাত্তাই দেয় না।” বিশেষ করে তিনি কালগারির বো ভ্যালি কলেজের সমালোচনা করে বলেন, মানহীন শিক্ষার কারণে শিক্ষার্থীরা সেখানে প্রতারিত হচ্ছে।

কানাডায় পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জীবন সংগ্রামের প্রধান দিকগুলো নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:

কানাডায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জসমূহ

সংকটের ধরণবাস্তব চিত্র ও প্রভাব
শিক্ষা ও ডিগ্রিনিম্নমানের কারিকুলাম এবং চাকরির বাজারে ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতাহীনতা।
আর্থিক বোঝাঅত্যধিক টিউশন ফি এবং বাড়ি ভাড়াসহ নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম।
কর্মসংস্থান সংকটদক্ষ কাজের অভাবে উবার চালানো বা গুদামে কায়িক শ্রম দিতে বাধ্য হওয়া।
শ্রম শোষণকম বেতনে অতিরিক্ত কাজ এবং প্রতিবাদ করলে চাকরি থেকে বহিষ্কারের হুমকি।
মানসিক অবস্থাবিদেশের মাটিতে তীব্র একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং দীর্ঘস্থায়ী হতাশা।
সামাজিক মিথস্ক্রিয়াস্থানীয়দের রক্ষণশীল আচরণ এবং প্রকৃত বন্ধুত্বের অভাব।

ওই শিক্ষার্থীর বর্ণনায় উঠে এসেছে এক অমানবিক জীবনযাত্রার চিত্র। তিনি জানান, কানাডায় জীবনযাত্রার ব্যয় এখন কল্পনাতীত। এই খরচ মেটাতে গিয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে দিনের বেশিরভাগ সময় ছোটখাটো কাজ করতে হয়। সেখানে ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স’ বা কাজের অবসরে নিজের জন্য সময় রাখা একটি বিলাসিতা মাত্র। শিক্ষার্থীদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অনেক নিয়োগকর্তা তাদের দিয়ে কম মজুরিতে হাড়ভাঙা খাটুনি করিয়ে নেন।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি। প্রবাস জীবনের একাকিত্ব এবং বৈষম্যের শিকার হয়ে অনেক শিক্ষার্থী নীরবে চোখের জল ফেলেন। কানাডীয়দের ভদ্র আচরণ থাকলেও তাদের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি করা প্রায় অসম্ভব বলে তিনি দাবি করেন। পরিশেষে, তিনি নিজ দেশের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ দিয়েছেন যে, নিজের দেশে থেকে লড়াই করা অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে এসে শোষিত হওয়ার চেয়ে ভালো। পশ্চিমা বিশ্বের রঙিন মোড়কে ঢাকা এই কঠিন সত্যটি কেবল সেখানে গেলেই টের পাওয়া যায়।