গ্রিনল্যান্ড এখন বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক উভয় পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত এই বৃহৎ দ্বীপটি ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে দ্বীপটি অধিগ্রহণের সম্ভাবনার কথা উত্থাপন করেছেন, যা ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক মহলে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। তবে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক আবিষ্কার গ্রিনল্যান্ডকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে, বিশেষ করে এ অঞ্চলের অন্যতম অদ্ভুত প্রজাতি—গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর নিয়ে।
সম্প্রতি এক যুগান্তকারী গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, এই হাঙ্গরগুলো “অন্ধ” নয়। এ পর্যন্ত প্রচলিত ধারণা ছিল, ২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা এই মন্থর গতির হাঙ্গর অন্ধ এবং শুধুমাত্র মৃত প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু জানুয়ারিতে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, হাঙ্গরের রেটিনা পূর্ণাঙ্গ এবং তারা আলো ও বৈপর্য়তের প্রতি সংবেদনশীল।
গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরের বৈশিষ্ট্য (সংক্ষিপ্ত তথ্য)
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| দৈর্ঘ্য | ১৫–২০ ফুট (প্রায় ৪.৫–৬ মিটার) |
| ওজন | ১,০০০ কেজি পর্যন্ত |
| গতিশীলতা | ধীর, তবে গভীর সমুদ্রে সক্রিয় |
| দৃষ্টি ক্ষমতা | পূর্ণাঙ্গ, আলো ও কনট্রাস্ট শনাক্ত |
| খাদ্যাভ্যাস | মৃত কারিবু, মেরুভাল্লুক, নারওয়াল, বেলুগা, এবং সম্ভাব্য সরাসরি শিকার |
| দীর্ঘায়ু | অনুমানিত ২০০–৫০০ বছর (কার্বন ডেটিং অনুসারে) |
| প্রজনন তথ্য | সীমিত; শেষ নথিভুক্ত গর্ভবতী হাঙ্গর ১৯৫০ সালে |
গবেষকরা জানিয়েছেন, হাঙ্গরের মন্থর গতির সঙ্গে তাদের খাদ্যাভ্যাসের বৈপর্য়্য স্পষ্ট। এরা পাখনাগুলো বেলুগা তিমির মতো ব্যবহার করে এবং গভীর ও অগভীর সমুদ্রের মধ্যে ডাইভ করতে সক্ষম। নাইজেল হাসি, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর বিশেষজ্ঞ, বলেছেন—“এরা একেবারে অবিশ্বাস্য প্রাণী, আমরা এদের অনেক কম মূল্যায়ন করি। আমাদের ধারণার চেয়ে এরা অনেক বেশি চতুর এবং দক্ষ।”
এদিকে জেনা এডওয়ার্ডস, কানাডার সামুদ্রিক পরিবেশবিদ, বলেন—“গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরের জীবনধারার এত কম তথ্য রয়েছে যে, আমরা কেবল অনুমানের ভিত্তিতে হাইপোথিসিস তৈরি করি। এদের পুরোপুরি বোঝার জন্য আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন।”
গবেষণার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো এই হাঙ্গরের প্রজনন প্রক্রিয়া এবং বংশবৃদ্ধি সম্পর্কে সীমিত তথ্য। ১৯৫০ সালে শেষবারের মতো একটি গর্ভবতী হাঙ্গর নথিভুক্ত হয়। এডওয়ার্ডস ও হাসি মনে করেন, হাঙ্গরগুলো অগভীর ও উষ্ণ পানিতে আসলেও এটি তাদের বিশ্বব্যাপী পরিভ্রমণের ইঙ্গিত দেয়, এবং তারা বাণিজ্যিক মাছ ধরার অঞ্চলেও বিচরণ করে।
উষ্ণায়নের কারণে আর্কটিক অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তন গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরের ভবিষ্যতকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। তবে গবেষকরা আশাবাদী, এরা যেকোনো খাদ্য ও পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকতে সক্ষম। নাইজেল হাসি মন্তব্য করেন—“যদি তারা শুধুমাত্র মৃত প্রাণী খেত, তবে কীভাবে এই গ্রহে এতকাল টিকে থাকতে পারত? এরা নিশ্চয়ই দক্ষ শিকারি।”
গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর আজও বিজ্ঞানীদের জন্য এক জীবন্ত ধাঁধা। প্রতিটি গবেষণা তাদের প্রতি মানবজাতির অজ্ঞানতা ও সীমিত বোঝাপড়ার সাক্ষ্য দিচ্ছে। এই রহস্যময় প্রাণী শুধুই প্রাণিক নয়, বরং প্রকৃতির চমকপ্রদ স্থায়িত্বের এক জীবন্ত প্রতীক।
