বিক্ষোভ দমনে ইরানে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়: নিহত ৬৪৮ ছাড়িয়েছে

ইরানে টানা ১৬ দিন ধরে চলমান তীব্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নরওয়েভিভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’-এর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১২ জানুয়ারি) পর্যন্ত এই হতাহতের হিসাব নিশ্চিত করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ৯ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোর, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, নিহতদের পাশাপাশি কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছে, যাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আরেকটি পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘এইচআরএএনএ’ নিহতের সংখ্যা ৫৪৪ বলে উল্লেখ করেছিল। তবে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ ও কঠোর সেন্সরশিপ আরোপের কারণে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও তেহরানের বিভিন্ন হাসপাতাল ও মর্গ থেকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় দেখা গেছে, নিহতদের মরদেহের স্তূপ এবং আহতদের আর্তনাদ। চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে; অনেক হাসপাতালে শয্যা ও জরুরি ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে।

এই রক্তক্ষয়ী দমনাভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ একাধিক ইউরোপীয় দেশ। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেত্তে কুপার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে ইরান সরকারকে মৌলিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার দাবি জানান। একই সুরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সার্বজনীন, এবং এসব অধিকারের পক্ষে যারা দাঁড়িয়েছেন, ফ্রান্স তাদের পাশে রয়েছে। এর আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতেও ইরানে হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানানো হয়।

পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনার জবাবে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি যুক্তরাজ্যকে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, কিছু বিদেশি শক্তি ও সংবাদমাধ্যমের ছদ্মবেশে সক্রিয় গোষ্ঠী দেশে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। একই সঙ্গে লন্ডনে ইরানি কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, প্রয়োজনে কূটনৈতিক কর্মীদের প্রত্যাহার করা হতে পারে।

গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাজার এলাকায় অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি ও রিয়ালের অব্যাহত দরপতনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই রাজনৈতিক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। নির্বাসিত শেষ শাহ-এর পুত্র রেজা পাহলভির সাম্প্রতিক আহ্বানের পর আন্দোলন আরও গতি পায়। বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ জনগণ প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, সরকার কঠোর অবস্থান বজায় রাখলে সামনে দিনগুলোতে হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।

বিক্ষোভসংক্রান্ত প্রধান তথ্য (সংক্ষেপে):

বিষয়তথ্য
বিক্ষোভের সময়কাল১৬ দিন
নিহতের মোট সংখ্যাঅন্তত ৬৪৮ জন
নিহত শিশু-কিশোরকমপক্ষে ৯ জন
আহতের সংখ্যাকয়েক হাজার
বিক্ষোভের সূচনা২৮ ডিসেম্বর
প্রধান কারণঅর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, শাসনবিরোধী দাবি

এই পরিস্থিতি ইরানের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে, যার প্রভাব দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।