মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের চরডুমুরিয়া এলাকায় বিএনপির সমর্থিত দুই গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। সর্বশেষ গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এতে করে ওই এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধ ঘিরে আতঙ্ক ও উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রায়হান খান (২২)। তিনি চরডুমুরিয়া খানবাড়ির বাসিন্দা রুস্তম খানের ছেলে এবং পেশায় একজন অটোরিকশা চালক ছিলেন। নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, সোমবার সকালে প্রতিদিনের মতো অটোরিকশা চালাতে বের হওয়ার সময় হঠাৎ সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হন রায়হান। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় পাঠানো হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চরডুমুরিয়া এলাকায় বিএনপির দুটি প্রভাবশালী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা চলছিল। একদিকে ছিলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আতিক মল্লিক ও মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ওহিদ মোল্লার অনুসারী শাহ কামাল গ্রুপ। অপরদিকে ছিলেন একই এলাকার সাবেক ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আওলাদ হোসেন ও আরিফ মীরের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ। স্থানীয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, সাংগঠনিক প্রভাব এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে এই দুই পক্ষের বিরোধ ক্রমেই সহিংস রূপ নেয়।
এই বিরোধের জের ধরেই সোমবার সকালে দুই গ্রুপের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে গুলির শব্দে পুরো এলাকা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আরিফ মীর। একই ঘটনায় আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হন—তাদের একজন ছিলেন রায়হান খান এবং অপরজন ইমরান। ইমরান বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
রায়হান খানের মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য হিসেবে অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
মুন্সীগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাইফুল আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রায়হান মারা গেছেন—এই তথ্য আমরা পেয়েছি।” তিনি আরও বলেন, “এই ঘটনায় এখনো কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি। তবে আমরা প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দুজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করেছি এবং তাদের মুন্সীগঞ্জ আদালতে পাঠানো হয়েছে।”
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংঘর্ষে ব্যবহৃত অস্ত্র, গুলির উৎস এবং ঘটনার পেছনের মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্তে তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের লড়াই থেকেই এই সহিংসতার সূত্রপাত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ ধরনের সহিংসতা নতুন নয়। তবে এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা মনে করেন, দলীয় শৃঙ্খলা জোরদার করা এবং সহিংস রাজনীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটতে পারে।
