বাহরাইনে মার্কিন তেলবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা ও অগ্নিকাণ্ড

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন যুদ্ধবিমানের গর্জনে প্রকম্পিত, ঠিক সেই মুহূর্তে সমুদ্রপথেও ছড়িয়ে পড়েছে সংঘাতের উত্তাপ। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের রণকৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দেশ বাহরাইনের একটি বন্দরে নোঙর করা মার্কিন পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাংকার ‘স্টেনা ইম্পেরেটিভ’ (Stena Imperative) ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে। সোমবার (২ মার্চ) ভোরে অজ্ঞাতনামা দুটি উড়ন্ত বস্তু বা ড্রোনের আঘাতে জাহাজটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্স এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

ঘটনার বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

স্থানীয় সময় রাত ৩টার দিকে যখন বন্দর এলাকা নিস্তব্ধ ছিল, ঠিক তখনই দুটি শক্তিশালী বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে স্টেনা ইম্পেরেটিভ। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অজ্ঞাত দুটি বস্তু সরাসরি জাহাজের ডেকে আঘাত হানে, যার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন ধরে যায়। জাহাজের ক্রু এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও জাহাজটির কাঠামোগত বেশ ক্ষতি হয়েছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘ভ্যানগার্ড’ জানিয়েছে, বড় ধরনের বিপদ এড়াতে জাহাজের সকল নাবিককে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে তারা সুস্থ আছেন।

নিচে ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ ও জাহাজের তথ্য তুলে ধরা হলো:

বিষয়বিবরণ
জাহাজের নামস্টেনা ইম্পেরেটিভ (Stena Imperative)
পতাকামার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA)
ঘটনার সময়সোমবার, ২ মার্চ, ভোর ৩:০০ ঘটিকা
ঘটনার স্থানবাহরাইন বন্দর এলাকা
আক্রমণের ধরনঅজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু (সম্ভাব্য ড্রোন)
হতাহতনেই (সকল নাবিক নিরাপদ)
মালিকানা প্রতিষ্ঠানস্টেনা বাল্ক (Stena Bulk)

আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রভাব ও প্রতিশোধের রাজনীতি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইরানও বসে নেই; তারা ইতিমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলি স্বার্থের ওপর পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। চলমান এই চরম উত্তেজনার মধ্যে ‘স্টেনা ইম্পেরেটিভ’ হলো প্রথম কোনো মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজ, যা সরাসরি হামলার শিকার হলো। সামুদ্রিক তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা এলএসইজি (LSEG) জানিয়েছে, হামলার ঠিক দুই দিন আগে অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি সর্বশেষ তার অবস্থান সংকেত পাঠিয়েছিল, এরপর থেকেই এটি রাডারের আড়ালে ছিল।

মালিকপক্ষ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

জাহাজটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান ‘স্টেনা বাল্ক’ এই স্পর্শকাতর বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলাটি সরাসরি কোনো রাষ্ট্র পরিচালনা না করলেও ইরানের মদতপুষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা ছায়াশক্তি এর পেছনে থাকতে পারে। পারস্য উপসাগর দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথে মার্কিন জাহাজে হামলা বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি

বাহরাইন কর্তৃপক্ষ এবং মার্কিন পঞ্চম নৌবহর (US 5th Fleet) বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। বর্তমানে জাহাজটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং বন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। এই ঘটনার পর লোহিত সাগর এবং ওমান উপসাগরে চলাচলকারী সকল বাণিজ্যিক জাহাজকে উচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো পক্ষই এখনো এই হামলার দায় স্বীকার না করলেও এটি যে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধেরই একটি অংশ, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।