বাবার সঙ্গে বিরোধের জেরে শিশু রাফিকে নৃশংস হত্যা

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় অনলাইন জুয়ার টাকা ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে আন্দালিব সাদমান রাফি (৯) নামের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঘাতক চক্র শিশুটিকে হত্যা করে তার মরদেহ একটি স্যানিটারি ল্যাট্রিনের রিং স্ল্যাবের ভেতরে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে লুকিয়ে রাখে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে নূর মুহাম্মদ খোকন (২০) নামের এক কলেজছাত্রকে আটক করেছে পুলিশ।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নিখোঁজ সংবাদ

নিহত আন্দালিব সাদমান রাফি উপজেলার বাঁশাটি ইউনিয়নের জমিনপুর গ্রামের জহিরুল ইসলামের পুত্র। সে মুক্তাগাছা শহরের রেসিডেন্সিয়াল মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পুলিশ ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (৮ মে) বেলা ১১টার পর থেকে রাফিকে এলাকায় আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তাকে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা বিচলিত হয়ে পড়েন। ওই রাতেই শিশুটির বাবা জহিরুল ইসলাম মুক্তাগাছা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) অন্তর্ভুক্ত করেন। নিখোঁজ সংবাদ পাওয়ার পর থেকে পুলিশ শিশুটির সন্ধানে তদন্ত শুরু করে।

সন্দেহভাজন আটক ও মরদেহের অবস্থান শনাক্ত

জহিরুল ইসলামের সন্দেহের ভিত্তিতে শনিবার (৯ মে) সকালে পুলিশ প্রতিবেশী নূর মুহাম্মদ খোকনকে আটক করে। খোকন স্থানীয় একটি কলেজের শিক্ষার্থী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেও এক পর্যায়ে সে শিশুটিকে অপহরণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে। নূর মুহাম্মদ খোকনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুক্তাগাছা থানা পুলিশ শনিবার দুপুরে তার বাড়িতে অভিযানে চালায়। এ সময় খোকনদের বাড়ির পেছনের একটি স্যানিটারি ল্যাট্রিনের রিং স্ল্যাবের ভেতর থেকে একটি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়। বস্তাটি খুললে নিখোঁজ শিশু রাফির প্রাণহীন দেহ পাওয়া যায়।

অনলাইন জুয়া ও বিরোধের কারণ

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে নূর মুহাম্মদ খোকন হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে অনলাইন জুয়া এবং শিশুটির বাবার সঙ্গে সৃষ্ট বিরোধের কথা উল্লেখ করেছে। খোকন অনলাইনে জুয়ায় আসক্ত ছিল এবং এই বিষয় নিয়ে জহিরুল ইসলামের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব চলছিল। জহিরুল ইসলাম তাকে বিভিন্ন সময় জুয়া খেলায় বাধা প্রদান করতেন।

জহিরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, খোকন অন্য এক ব্যক্তির কাছে অনলাইন জুয়ার প্রায় এক লাখ টাকা পাওনা ছিল। কিছুদিন আগে জহিরুলসহ স্থানীয় কয়েকজন মিলে ওই পাওনা টাকা উদ্ধারে ভূমিকা রাখেন। তবে পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জহিরুল ও তার সঙ্গীরা উদ্ধারকৃত টাকার একটি অংশ নিজেদের জন্য রেখে দিলে খোকন চরম ক্ষুব্ধ হয়। জহিরুল ইসলাম আরও জানান, জুয়া খেলায় বারবার নিষেধ করায় খোকন তার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজছিল। সেই আক্রোশ থেকেই রাফিকে অপহরণের পর হত্যা করে মরদেহ গুম করা হয়েছিল।

আইনি পদক্ষেপ ও পুলিশের বক্তব্য

মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান জানান, শিশু নিখোঁজের জিডি হওয়ার পর থেকেই পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করছিল। সন্দেহভাজন খোকন রাফিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। খোকন একাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কি না অথবা এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ নিবিড়ভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নিহত রাফির পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত খোকনের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অনলাইন জুয়ার মতো অপরাধ কীভাবে একটি কিশোরকে হন্তারক হিসেবে গড়ে তুলেছে, তা নিয়ে এলাকায় গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।