জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুলাই ২০২৬, ২:১৭ পিএম

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর বর্ষার অতিবৃষ্টির ফলে বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় বাঙালি ও করতোয়া নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নদী দুটির তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি এবং সরকারি অবকাঠামো। সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে শেরপুরের খানপুর ইউনিয়নের চকখানপুর গ্রামের হাওলাদার পাড়ায়, যেখানে নদীভাঙনের কবলে পড়ে পুরো একটি গ্রাম এখন অস্তিত্ব সংকটে।
Table of Contents
চকখানপুর গ্রামের হাওলাদার পাড়াটি প্রধানত মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের আবাসস্থল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি নদীতে মাছ ধরেই সংসার চালিয়ে আসছেন এখানকার বাসিন্দারা। কিন্তু সেই নদীই এখন তাঁদের ভিটেমাটি কেড়ে নিচ্ছে।
গ্রামটির ৭৫ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা চৈতন্য সরকার নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, “কষ্ট কইরা এই গ্রাম গড়ছিলাম। একসময় ইহিনে (এখানে) ১৩০টি বাড়ি ছিল। নদী একে একে সব নিয়া গেছে। বাড়ি হারাইয়া মানুষও গ্রাম ছাইড়া চইলা গেছে। নদী আমাগারে নিঃস্ব কইরা দিছে।”
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, গত ১৫ বছরে চকখানপুর গ্রামে অন্তত ১১০টি পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারিয়েছে। বর্তমানে মাত্র ২০টি পরিবার কোনো রকমে টিকে আছে। চলতি মৌসুমের অব্যাহত ভাঙনে এই পরিবারগুলোর মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকুও নদীতে তলিয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। রায়চরণ হাওলাদার, সাধনা রানী হাওলাদার, জীতেন হাওলাদার ও নীলকান্ত হাওলাদারের মতো অনেক ভুক্তভোগী এর মধ্যেই একাধিকবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন। সাধনা রানী হাওলাদার আক্ষেপ করে বলেন, “এ পর্যন্ত তিনবার ভাঙনের কারণে বাড়ি সরাইছি। এবার ভাঙলি নতুন বাড়ি বানানের জাগা নাই। এই চিন্তায় রাইতে ঘুম আসে না।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, কেবল চকখানপুর নয়, শেরপুর উপজেলার মোট পাঁচটি ইউনিয়নে বিস্তৃত এলাকায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন পয়েন্টে বাঙালি ও করতোয়া নদীর গ্রাস প্রতিরোধে জরুরি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় বিপন্ন হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার।
নদী ভাঙনের স্থান ও আনুমানিক পরিমাপের বিবরণ নিচে সারণিবদ্ধ করা হলো:
| ক্রম | সংশ্লিষ্ট নদী | ইউনিয়ন | ভাঙনকবলিত এলাকা/গ্রাম | ভাঙনের আনুমানিক পরিমাপ (মিটার) |
| ১ | বাঙালি | খানপুর | বড়ইতলী উত্তর পাড়া | ২৫০ |
| ২ | বাঙালি | খানপুর | চকখানপুর (হাওলাদার পাড়া) | ৪০০ |
| ৩ | বাঙালি | খানপুর | দহখানপুর পাড়া | ১৫০ |
| ৪ | বাঙালি | সুঘাট | সুঘাট বাজার (ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন) | ৫০০ |
| ৫ | বাঙালি | সুঘাট | মধ্যভাগ গ্রাম | ১৫০ |
| ৬ | বাঙালি | সুঘাট | বিনোদপুর (সাহেববাড়ি এলাকা) | ৬০০ |
| ৭ | বাঙালি | সুঘাট | চকপাহাড়ি গ্রাম | ৩০০ |
| ৮ | বাঙালি | সীমাবাড়ি | ঘাসুরিয়া গ্রাম | ৩০০ |
| ৯ | বাঙালি | সীমাবাড়ি | নলুয়া গ্রাম | ২০০ |
| ১০ | বাঙালি | খামারকান্দি | খামারকান্দি (বাঁ তীর) | ১০০ |
| ১১ | বাঙালি | খামারকান্দি | ঝাজর উত্তর পাড়া | ২০০ |
| ১২ | করতোয়া | গাড়িদহ | ফুলবাড়ী ঘাটপার সেতু এলাকা | ১৫০ |
| ১৩ | করতোয়া | গাড়িদহ | কালশিমাটি স্কুল সংলগ্ন এলাকা | ২০০ |
| ১৪ | করতোয়া | মির্জাপুর | কাশিয়াবালা গ্রাম | ২০০ |
নদীভাঙনের প্রভাব পড়েছে সাধারণ জীবনের দৈনন্দিন নিরাপত্তায়। সীমাবাড়ি ইউনিয়নের ঘাসুরিয়া গ্রামের দিনমজুর দুই ভাই আবদুস সাত্তার ও আবদুস সালামের ভিটেমাটির বড় অংশ নদীতে তলিয়ে গেছে। রান্নাঘরের অর্ধেকটা নদীগর্ভে চলে গেলেও সেই ঝুঁকি নিয়েই চলছে পরিবারের গৃহস্থালি কাজ। স্থানান্তরের জায়গা না থাকায় তাঁরা চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ, দুই বছর আগে নদীর খননকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর থেকেই মূল ভাঙন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
এছাড়া নলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের প্রায় ৪০ মিটার অংশ ইতিমধ্যেই বাঙালি নদীর পেটে চলে গেছে। বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা জানান, মাঠ ভেঙে যাওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা ও শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক স্থানে ছোট শিশুদের নদীতে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে কাপড়ের বেড়া দিয়ে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন ভুক্তভোগী অভিভাবকেরা।
খানপুর ইউপি চেয়ারম্যান পিয়ার উদ্দিন, খামারকান্দি ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান এবং গাড়িদহ ইউপির চেয়ারম্যান তবিবুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, নিজ নিজ এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা ও ভাঙন পরিস্থিতির বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।
বগুড়া-৫ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের পর ভুক্তভোগীদের সান্ত্বনা দেন এবং ভাঙনরোধে দ্রুত স্থায়ী বাঁধ বা প্র প্রতিরক্ষামূলক কাজ শুরু করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে নতুন অর্থবছরে এখনো প্রয়োজনীয় সরকারি অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। অর্থ বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে জিওব্যাগ ফেলাসহ জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ শুরু করা হবে।
মন্তব্য