রাজধানীর বনানীর ভিউ ফাইন্ডারে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল শাকুর মজিদের গবেষণাধর্মী প্রামাণ্যচিত্র ‘ভাটিবাংলার অধিরাজ: বাউলকবি রশিদ উদ্দিনের অধিকারহীনতার সন্ধানে’-এর প্রথম প্রদর্শনী। ২১ জানুয়ারি এই মহাজন সাধকের ১৩৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই প্রদর্শনী বাংলার লোকসংগীতের ইতিহাসে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রটি দাবি করছে, ‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া’ বা ‘শুয়া চান পাখি’র মতো আকাশছোঁয়া জনপ্রিয় গানগুলোর প্রকৃত রচয়িতা নেত্রকোনার মরমী সাধক রশিদ উদ্দিন।
বিস্মৃত সাধক ও তাঁর অমর সৃষ্টি
১৮৮৯ সালের ২১ জানুয়ারি নেত্রকোনার মদন উপজেলার বাহিরচাপড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রশিদ উদ্দিন। তিনি কেবল একজন সাধারণ বাউল ছিলেন না, বরং ছিলেন শাহ আবদুল করিম, উকিল মুন্সি ও জালাল খাঁর মতো প্রবাদপ্রতিম বাউলদের দীক্ষাগুরু। অথচ ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম আজ ম্লান। শাকুর মজিদ ২০২৫ সালের শেষভাগে বাহিরচাপড়ায় কবির উত্তরসূরিদের কাছে গিয়ে জানতে পারেন এক করুণ সত্য। রশিদ উদ্দিনের হাতে লেখা মূল পাণ্ডুলিপি থেকে গানগুলো চুরি করে অনেক প্রভাবশালী শিল্পী ও সংগ্রাহক নিজেদের নামে চালিয়ে দিয়েছেন।
নিচে প্রামাণ্যচিত্রের তথ্যমতে বাউল রশিদ উদ্দিনের বিতর্কিত ও প্রকৃত সৃষ্টির একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| গানের শিরোনাম | প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা (যাদের নামে পরিচিত) | প্রামাণ্যচিত্রের দাবি ও তথ্যসূত্র |
| এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া | আব্দুল আলীম বা অন্য শিল্পী | মূল পাণ্ডুলিপি ও শিষ্য পরম্পরায় রশিদ উদ্দিনের। |
| শুয়া চান পাখি | বারী সিদ্দিকী বা উকিল মুন্সি | রশিদ উদ্দিন রচিত মরমী সংগীত। |
| মা গো মা ঝি গো ঝি | লোকসংগীত সংগ্রাহকবৃন্দ | পারিবারিক পাণ্ডুলিপিতে প্রাপ্ত তথ্য। |
| দেখবে কী শুনবে কী ওরে ও মন | লোকজ লোকালয় | রশিদ উদ্দিনের হাতে লেখা মূল পাণ্ডুলিপি। |
সৃজনশীলতা ও মেধাস্বত্বের লড়াই
নির্মাতা শাকুর মজিদের এই তথ্যচিত্রটি কেবল একজন কবির জীবনী নয়, বরং এটি বাংলার লোকজ মেধাস্বত্ব বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি’ রক্ষার এক দীর্ঘ লড়াই। কবির উত্তরাধিকারীরা অভিযোগ করেছেন, পাণ্ডুলিপিগুলো দেখার নাম করে অনেক গবেষক ও শিল্পী গানগুলো নিয়ে গেছেন এবং সুর বা বাণীর কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে নিজেদের স্বত্ব দাবি করেছেন। এর ফলে প্রকৃত স্রষ্টা আজ ইতিহাস থেকে নির্বাসিত। নির্মাতা শাকুর মজিদ বলেন, “যাঁর গানে একটি জাতির ভাবজগত তৈরি হয়েছে, তাঁর প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়াই এই প্রামাণ্যচিত্রের মূল লক্ষ্য।”
সুধীজন ও গবেষকদের প্রতিক্রিয়া
প্রদর্শনীর পর আলোচনায় অংশ নিয়ে সাংবাদিক ও লেখক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, “এই প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে শাকুর মজিদ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন। এখন দায়িত্ব গণমাধ্যমের—প্রচলিত ভুলগুলো সংশোধন করে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা।” গবেষক অধ্যাপক এ কে এম মাজহারুল ইসলাম মনে করেন, এই তথ্যচিত্রটি সরকারি উদ্যোগে সারা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত, যাতে এই মহান সাধকের পুনর্জন্ম ঘটে।
প্রকৌশলী শাহাদাত খান মন্তব্য করেন, এই উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং ভবিষ্যতে বাংলার সমৃদ্ধ লোকসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সঠিক তথ্যসহ সংরক্ষণের পথ উন্মোচিত হবে। দর্শকদের অভিমত, এই প্রামাণ্যচিত্র কেবল রশিদ উদ্দিনকে নতুন করে চেনার মাধ্যম নয়, বরং এটি বাংলার লোকসংগীতের ইতিহাস পুনর্লিখনের এক বৈপ্লবিক প্রচেষ্টা।
বাউল রশিদ উদ্দিনের অধিকারহীনতার এই আখ্যান বাংলার অগণিত অখ্যাত স্রষ্টাদের বঞ্চনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রামাণ্যচিত্রটি যদি শেষ পর্যন্ত সংগীতে রশিদ উদ্দিনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবেই সার্থক হবে এই শিল্পযাত্রা।
