বাংলা সুরভুবনের এক চিরকালীন গুরুপুরুষ সলীল চৌধুরীর জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৯ নভেম্বর—এ দিনটি এক স্রষ্টার জন্মদিন, যাকে বাংলা, ভারতীয়, কিংবা বিশ্বসঙ্গীতের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে চিহ্নিত করতে কেবল শব্দের সাহায্যে পূর্ণাঙ্গ পরিচয় দেওয়া যায় না। তিনি শুধু সুরকার, গীতিকার, কবি বা গল্পকারই নন, তিনি ছিলেন একজন শিল্পী, সংগঠক, বিপ্লবী চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব—এক কথায় মানবকলার অগ্রদূত।
তিনি সলীল চৌধুরী—যিনি স্নেহভরে গুণগ্রাহীদের কাছে ‘সলীলদা’ হিসেবে পরিচিত।
তার সৃষ্টিকে বোঝার জন্য শুধুমাত্র সঙ্গীত-ব্যাকরণই যথেষ্ট নয়। এই সৃষ্টির গভীরে পৌঁছানোর জন্য মানবমনের চেনা-বিচেনা সীমানার বাইরে চিন্তা করতে হবে, সমাজমনস্কতার প্রতি আস্থা রাখতে হবে, এবং নান্দনিক অনুভূতির পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তির ওপরেও নির্ভর করতে হবে। কারণ সলীল চৌধুরী কখনও সঙ্গীত তৈরি করেননি, তিনি যুগ রচনা করেছেন।

শৈশব: চা-বাগানের নিসর্গে গড়ে ওঠা এক শিল্পযাত্রা
১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সোনারপুর অঞ্চলের গাজিপুরে জন্মগ্রহণ করেন সলীল চৌধুরী। তার শৈশবটি কাটে আসামের চা-বাগানের পরিবেশে, যেখানে তার বাবা—জ্ঞানেন্দ্রময় চৌধুরী ছিলেন একজন চিকিৎসক। বাবার সংগীতের প্রতি আগ্রহ, পাশ্চাত্য ক্লাসিকাল সঙ্গীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ এবং মঞ্চনাটকের প্রতি তার ভালবাসা, ছোট সলীলের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
তার শৈশবেই বাঁশি, পিয়ানো, এসরাজসহ বহু বাদ্যযন্ত্রের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়, আর সেখান থেকেই সংগীতজীবনে প্রবেশ। হারিনাভি বিদ্যালয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর, কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

সাংস্কৃতিক বিপ্লব: আইপিটিএ-র দিনগুলোর আগুন
১৯৪৪ সালে কলকাতায় এসে সলীল চৌধুরী যোগ দেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ)-তে। এসময় থেকেই তিনি সমাজঘনিষ্ঠ গান লেখা শুরু করেন, যা পরে ‘গণসংগীত’ নামে আলাদা এক ধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়। “গাঁয়ের বধূ”, “বিচারপতি”, “রানার”, “অবাক পৃথিবী”—এসব গানে সমাজের সংগ্রামী জীবনের কথা প্রকাশ পেয়েছে। সলীলের গানগুলো সাধারণ মানুষের রক্তমাংসের কথা বলতো, বাস্তবের শাসন ও সংগ্রামের কথা ব্যাখ্যা করতো।
মাত্র ২০ বছর বয়সে ‘গাঁয়ের বধূ’ গানের সুর রচনা করেই তিনি বিশেষভাবে পরিচিত হন এবং তাঁর এই গানকে প্রথম সারির শিল্পীরা স্বীকৃতি দেন, যেমন—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।

চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ: ‘দুই বিঘা জমি’—যাত্রার ইতিহাস
সলীল চৌধুরীর প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র পরিবর্তন মুক্তি পায় ১৯৪৯ সালে। এরপর ১৯৫৩ সালে বিমল রায়ের দো ভিঘা জমিন ছবির সুরে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, এই চলচ্চিত্রটির গল্পটি ছিল সলীলের ছোটগল্প রিকসাওয়ালা অবলম্বনে। এই চলচ্চিত্রটি ফিল্মফেয়ার সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পায়, যা সলীলকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি দেয়।

সুরের বহুভাষিক বিস্তার
সলীল চৌধুরী বাংলা, হিন্দি, মালয়ালম, তামিল, তেলুগু, মারাঠি, ওড়িয়া, গুজরাটি, অসমিয়া—এমন বহু ভাষায় সুর দিয়েছেন। তার গান শুধুমাত্র ভারতীয় চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মালয়ালম সিনেমাতেও তিনি সুর দিয়েছেন, যেমন চিম্মিন (১৯৬৪) সিনেমায়। সেখান থেকে তার গান দক্ষিণ ভারতেও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়।

পশ্চিমা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সঙ্গে অসামান্য মিশ্রণ
সলীল চৌধুরী ছিলেন সঙ্গীতের এক বিস্ময়কর ফিউশনিস্ট। তিনি পশ্চিমা ক্লাসিকাল সঙ্গীত এবং ভারতীয় সঙ্গীতকে এক অসাধারণ দক্ষতায় মিলিয়ে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছিলেন। কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ:
• মোজার্টের Symphony No. 40 এর টেম্পো ব্যবহার:
“ইতনা না মুঝে তু পেয়ার বাড়া” (ছায়া)
• শপ্যাঁর সুরধারা:
“রাতো কি সায়ে ঘানে” (অন্যদাতা)

তার শিল্পদর্শন: মানুষের জন্য গান
সলীল বিশ্বাস করতেন সঙ্গীতের মূল দায়িত্ব হচ্ছে সমাজকে সচেতন করা। তাঁর গান শুধুমাত্র সুরের নয়, তা ছিল মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়।
তিনি ছিলেন মানুষের সুরকার, যিনি মানুষের সংগ্রাম ও আশা-নিরাশার কথা গান দিয়ে প্রকাশ করেছেন।

পারিবারিক পরিসর
সলীল চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী ছিলেন জ্যোতি চৌধুরী, পরে তিনি বিবাহ করেন শিল্পী সবিতা চৌধুরীকে, যিনি তার বহু গানের গায়িকা ও সহযাত্রী ছিলেন। তার দুই কন্যা এবং এক পুত্র রয়েছে।

গ্রন্থ ও সাহিত্যকীর্তি
সলীল ছিলেন এক অনন্য কবি ও লেখক। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো:
• প্রান্তরের গান
• সলীল চৌধুরীর গান (১৯৮৩)
• জীবন উজ্জীবন (আত্মজীবনী)

পুরস্কার
সলীল চৌধুরী পেয়েছিলেন:
• ফিল্মফেয়ার সেরা সঙ্গীত পরিচালক পুরস্কার—মধুমতি (১৯৫৮)
• সঙ্গীত নাটক একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৮)

সলীল চৌধুরীর মননশীলতা: স্রষ্টা থেকে বিপ্লবী
সলীল ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি শ্রেণিহীন সমাজ, সমঅধিকার, মানবিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য তার সঙ্গীতের মাধ্যমে কথা বলেছেন। তার গানগুলি মাটির মানুষের কথা বলে, শ্রমিকের কথা বলে, আন্দোলনের কথা বলে।
“মানুষের জন্য গান”—এটাই ছিল তার সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু।

চিরকালীনতা: কেন সলীল আজও প্রাসঙ্গিক
আজকের দিনে সলীল চৌধুরীকে ভারতীয় ফিউশন সঙ্গীতের পথিকৃৎ, গণসংগীতের শ্রেষ্ঠ নির্মাতা, বাস্তববাদী গল্পকার এবং মানবিক কলার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার সুর আজও বাজলে বোঝা যায়, সময়ের স্রোত বদলায়, কিন্তু প্রতিভার মহিমা কখনও ম্লান হয় না।

অন্তিম শ্রদ্ধা
১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সলীল চৌধুরী আমাদের ছেড়ে চলে যান, তবে তার সুর, তার বাণী, তার শিল্প আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।

 

এসএস