বাংলাদেশের ‘চিকেন নেক’: ভূ-রাজনীতির জীবনরেখা ও এক কৌশলগত দুর্বলতা

দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূগঠনে এমন কিছু অঞ্চল আছে, যেগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। তার মধ্যে অন্যতম হলো ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত সেই সরু ভূখণ্ড, যেটি সবাই চেনে “চিকেন নেক” বা আনুষ্ঠানিকভাবে সিলিগুড়ি করিডর নামে। এই করিডরই ভারতের মূল ভূখণ্ডকে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

বাংলাদেশের জন্য এই করিডর কেবলমাত্র পার্শ্ববর্তী ভূমি নয় — এটি এক ভূ-রাজনৈতিক কব্জা বিন্দু, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও কূটনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডর সবচেয়ে সরু জায়গায় মাত্র ২০–২২ কিলোমিটার প্রশস্ত। পশ্চিমে নেপাল, উত্তরে ভুটান, দক্ষিণে বাংলাদেশ — এই তিন দেশের মাঝে আটকে থাকা এই ভূখণ্ড এশিয়ার সবচেয়ে সংবেদনশীল কৌশলগত অঞ্চলগুলোর একটি। অনেকেই একে বলে ভারতের “Achilles’ heel” — অর্থাৎ কৌশলগত দুর্বল বিন্দু।

বাংলাদেশের জন্য এই সংকীর্ণ করিডর কেবল একটি মানচিত্রের দাগ নয়। এর ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের বাণিজ্যপথ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ এবং ভারত–চীন শক্তির ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের এই “চিকেন নেক” বুঝতে হলে এর ভৌগোলিক গঠন, ঐতিহাসিক পটভূমি ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা — সব একসাথে দেখতে হবে।

Table of Contents

ভূগোল ও অবস্থান

সিলিগুড়ি করিডর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরাংশে অবস্থিত। এটি ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখার একমাত্র স্থলপথ — যথা: আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মণিপুর ও অরুণাচল প্রদেশ।

এই করিডরের একদিকে হিমালয়ের পাদদেশ, আর অন্যদিকে সমভূমি — চারপাশ ঘেরা:

  • পশ্চিমে নেপাল,
  • উত্তর-পূর্বে ভুটান,
  • দক্ষিণে বাংলাদেশ,
  • উত্তর-পশ্চিমে সিকিম।

এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা, মহানন্দা ও জলঢাকা নদী — যেগুলো দক্ষিণমুখে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। করিডরের ভূমি সমতল, চারপাশে চা-বাগান, ছোট ছোট শহর ও সামরিক ঘাঁটি। এখানকার বাগডোগরা বিমানবন্দর এবং নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন এই অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার মূল সেতুবন্ধ।

বাংলাদেশের পঞ্চগড়লালমনিরহাট জেলা থেকে এই করিডরের দূরত্ব মাত্র ২০–২৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল এশিয়ার অন্যতম কৌশলগত পথের ঠিক নিচেই অবস্থান করছে — যা এক ভৌগোলিক সুবিধা, আবার সম্ভাব্য ঝুঁকিও বটে।

“চিকেন নেক” নামের উৎপত্তি

“চিকেন নেক” নামটি এসেছে এই ভূখণ্ডের মানচিত্রীয় আকার থেকে। উপরে থেকে দেখলে ভারতের মূল ভূখণ্ডটি মুরগির দেহের মতো এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলটি যেন তার মাথা — এই দুই অংশকে সংযুক্ত করেছে মাত্র একটি সরু গলা বা “নেক”। সেই থেকেই ভূ-রাজনৈতিক আলোচনায় এই নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

যদিও নামটি মজার শোনায়, এর অর্থ কিন্তু গভীর। এই সরু “গলা” ভারতের জন্য একই সঙ্গে জীবনরেখাচোক পয়েন্ট। এখানে যদি কোনো সামরিক হামলা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘটে — তাহলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এই সম্ভাবনাই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম মূল কারণ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশ বঙ্গ থেকে আধুনিক সীমান্ত পর্যন্ত

চিকেন নেকের গুরুত্ব শুরু হয় উপনিবেশিক যুগে।
ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলা, আসাম, ভুটান ও বর্তমান বাংলাদেশের বহু অঞ্চল একত্রে ছিল একই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের অংশ।
গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে মানুষ, পণ্য ও সংস্কৃতি ছিল অবাধে চলাচলের মধ্যে।

কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগ সেই চিত্র পাল্টে দেয়।
পূর্ববঙ্গ হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান (পরবর্তীতে বাংলাদেশ), ফলে ভারতের সরাসরি পূর্বাঞ্চলীয় যোগাযোগ ছিন্ন হয়।
যে অঞ্চল একসময় অবিচ্ছিন্ন ছিল, তা হঠাৎ করেই পরিণত হয় কঠিন সীমান্তে।

এরপর থেকে ভারতের জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পৌঁছানোর একমাত্র পথ হয় এই সিলিগুড়ি করিডর
প্রথমদিকে এটি কেবল যোগাযোগের অসুবিধা ছিল, কিন্তু ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে এটি পরিণত হয় কৌশলগত দুঃস্বপ্নে।

তিব্বতের দিক থেকে চীনা বাহিনী যদি দক্ষিণে অগ্রসর হয়, তাহলে সহজেই করিডরটি হুমকির মুখে পড়ে। আবার দক্ষিণ দিকের পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) অস্থিতিশীল হলে, ভারত তখন দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়ে।
অতএব, দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক ইতিহাসের শুরু থেকেই “চিকেন নেক” হয়ে ওঠে এক স্থায়ী নিরাপত্তা উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু

বাংলাদেশ ও করিডর: নৈকট্যের ভূগোল

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই করিডরকে সরাসরি প্রভাবিত করে। করিডরটি বাংলাদেশের রংপুর বিভাগ-এর একেবারে উত্তর দিকে, যা স্বাভাবিকভাবেই বাণিজ্য ও পরিবহনপথের সঙ্গে যুক্ত।

  • বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর (পঞ্চগড়) থেকে করিডরের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার।
  • পার্বতীপুর–নিউ জলপাইগুড়ি রেললাইন, যা ব্রিটিশ আমলে চালু ছিল, এখনো সম্ভাব্য আন্তঃদেশীয় ট্রানজিট রুট হিসেবে বিদ্যমান।
  • এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ক (AH-2) এই অঞ্চলের মধ্য দিয়েই গেছে, যা বিবিআইএন (বাংলাদেশ–ভুটান–ভারত–নেপাল) উদ্যোগের অন্যতম মূল অংশ।

বাংলাদেশের জন্য এই করিডরের স্থিতিশীলতা মানে উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্য, সীমান্তনিরাপত্তা, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ ও জ্বালানি সহযোগিতার ভারসাম্য রক্ষা। যদি এই অঞ্চলে কোনো সামরিক সংঘাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে, তার প্রভাব বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কৌশলগত ও সামরিক গুরুত্ব

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে

প্রতিরক্ষার দিক থেকে সিলিগুড়ি করিডর হলো ভারতের ভূ-রাজনৈতিক বটলনেক। এটি ভারতের সাতটি উত্তর-পূর্ব রাজ্যের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগরেখা। মাত্র ২০ কিলোমিটারের সরু করিডরে যেকোনো সীমিত সামরিক হামলাই ভারতের এক-সপ্তমাংশ ভূখণ্ডকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে।

ভারতের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা একে প্রায়ই বলেন ‘ডুমসডে চোক পয়েন্ট’ — অর্থাৎ একদিনের সামান্য গোলযোগেই বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা। বিশেষত চীনের চুম্বি ভ্যালি, যেখানে ভারত–ভুটান–চীনের সীমান্ত মিলিত হয়েছে, সেই অঞ্চল থেকেই এই করিডরকে সহজেই হুমকি দেওয়া যায়। ২০১৭ সালের ডোকলাম সংকটে এই আশঙ্কা বাস্তব রূপ নেয় — যখন ভারত ও চীনা বাহিনী দুই মাস ধরে মুখোমুখি অবস্থানে ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে করিডরের দক্ষিণ দিক — যা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত — হয়ে ওঠে ভারতের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য, যাতে কোনো তৃতীয় শক্তি বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে এই করিডরকে বিপন্ন করতে না পারে।

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে

বাংলাদেশের জন্য এই করিডরের এত কাছে থাকা মানে এক সামরিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলের পাশে অবস্থান করা। সিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি ও হাসিমারায় ভারতের সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বিএসএফের ঘাঁটি রয়েছে।

যদিও এই সামরিক উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য সরাসরি হুমকি নয়, তবু এটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নজরদারি, বাণিজ্য ও মানুষের চলাচলে প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সীমান্ত নজরদারি কখনো কখনো স্থানীয় জীবিকা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও আঞ্চলিক যোগাযোগ

চিকেন নেক কেবল সামরিক সংযোগ নয়, এটি এক অর্থনৈতিক শিরা — ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে প্রতিটি ট্রেন, ট্রাক ও বিমানের যোগাযোগ এই করিডর দিয়েই হয়। বাংলাদেশের জন্য এখানেই লুকিয়ে আছে বিপুল সম্ভাবনা।

উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার

বাংলাদেশ যদি তার ভূখণ্ড দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বে ট্রানজিট সুবিধা দেয়, যেমন বাংলাবান্ধা–ফুলবাড়ি বা বুড়িমারী–চ্যাংড়াবান্ধা রুট ব্যবহার করা যায়, তাহলে কলকাতা থেকে গৌহাটি পর্যন্ত যাত্রা ১,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি কমে যাবে।
এটি উভয় দেশের জন্য লাভজনক হতে পারে এবং বাংলাদেশকে পরিণত করবে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিক্স হাবে

বিবিআইএন ও বিমসটেক করিডর

বিবিআইএন (বাংলাদেশ–ভুটান–ভারত–নেপাল) পরিবহন উদ্যোগ এবং বিমসটেক (BIMSTEC) অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল সেতুবন্ধ হিসেবে সিলিগুড়ি করিডরকে ধরা হয়।
যখন রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন সম্পন্ন হবে, তখন এই করিডর একদিন “বটলনেক” থেকে পরিণত হবে বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারে — যা বঙ্গোপসাগর থেকে হিমালয় পর্যন্ত সংযোগ দেবে।

সীমান্ত বাণিজ্য ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি

বাংলাবান্ধা, বুড়িমারী ও হিলি সীমান্ত অঞ্চলে শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রতিদিন সীমান্ত বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করেন। কৃষিপণ্য, টেক্সটাইল, নির্মাণসামগ্রী — সব কিছুই এই পথ দিয়ে আসা-যাওয়া করে। কিন্তু সিলিগুড়ি করিডরে সামান্য যানজট বা নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলেই এই ক্ষুদ্র অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মাধ্যমেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক জীবিকা কতটা এই করিডরের স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

চীন–ভারত–বাংলাদেশ ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে করিডর

চীনের প্রভাব

তিব্বতে চীনের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর আওতায় নেপাল ও মিয়ানমারে চলমান প্রকল্পগুলো ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চীনের সড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক এখন সিলিগুড়ি করিডর থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে গেছে — ফলে নয়াদিল্লির ‘অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা’ আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি এক কৌশলগত ভারসাম্যের দড়ির খেলা। ঢাকা বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখেছে, বিশেষ করে BRI প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে; আবার একই সময়ে ভারতীয় ট্রানজিট, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
অতএব, এই দুই পরাশক্তির মাঝখানে অবস্থান করে বাংলাদেশকে চালাতে হচ্ছে এক সতর্ক কূটনীতি — যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে সমন্বয় দরকার।

ডোকলাম সংকট ও আঞ্চলিক প্রতিধ্বনি

২০১৭ সালের ডোকলাম সংকট এই অঞ্চলের উত্তেজনা কত দ্রুত তীব্র হতে পারে, তার এক বাস্তব উদাহরণ। দুই মাসব্যাপী ভারত–চীন মুখোমুখি সংঘর্ষ শেষে কূটনৈতিক আলোচনায় বিষয়টি মীমাংসিত হলেও, তা সিলিগুড়ি করিডরের অরক্ষিত অবস্থানকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে।

এই করিডরে যে কোনো অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের জন্যও পরোক্ষ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে — যেমন: শরণার্থী প্রবাহ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পড়তে পারে।

পরিবেশ ও মানবিক বাস্তবতা

সামরিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট ছাড়াও করিডরের প্রাকৃতিক ও সামাজিক মাত্রা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলটি পূর্ব হিমালয় জীববৈচিত্র্য হটস্পটের অংশ, যেখানে রয়েছে বনভূমি, চা-বাগান ও উর্বর সমভূমি।

কিন্তু দ্রুত সামরিকীকরণ, অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের চাপে এই নাজুক পরিবেশ আজ ঝুঁকির মুখে। নদী ও বন্যপ্রাণীর আবাসভূমি ধ্বংস হচ্ছে, একই সঙ্গে মানুষের জীবনযাপনেও আসছে পরিবর্তন।

মানবিক দিক থেকেও এই করিডর এক আন্তঃসীমান্ত বাস্তবতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তরাঞ্চলের মাঝে ঐতিহাসিকভাবে জনগোষ্ঠী স্থানান্তর ঘটেছে, যা আজও স্থানীয় জনবিন্যাসে প্রভাব ফেলছে। সীমান্ত বেড়া, ক্ষুদ্র বাণিজ্য ও শ্রম অভিবাসন — সবকিছুই এই অঞ্চলের প্রতিদিনের জীবনের অংশ, যদিও তা প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা: সহযোগিতা নাকি সংঘাত?

সিলিগুড়ি করিডর ও বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তের ভবিষ্যৎ দুই রকম পথে বিকশিত হতে পারে — একটি সহযোগিতার পথ, আরেকটি সংঘাতের পথ

চিত্র এক: সংযোগের করিডর

আশাবাদী দৃশ্যপটে বাংলাদেশ ও ভারত এই সংকীর্ণ করিডরকে আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে পারে।
রেলপথ আধুনিকীকরণ, যৌথ কাস্টমস সুবিধা ও সমন্বিত লজিস্টিক ব্যবস্থার মাধ্যমে করিডরটি একদিন হতে পারে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে উত্তর-পূর্ব হিমালয় অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করলে এই করিডর একটি বাস্তব বাণিজ্যিক সেতুবন্ধন হয়ে উঠতে পারে। এটি বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত লক্ষ্য — “আঞ্চলিক ট্রানজিট ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ” — বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।

চিত্র দুই: সংঘাতের করিডর

অন্যদিকে, যদি চীন–ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ, বা রাজনৈতিক অবিশ্বাস বাড়ে, তাহলে এই করিডর হয়ে উঠতে পারে সংঘাতের মঞ্চ। ত্রি-সীমান্ত এলাকায় (ভারত–চীন–ভুটান) কোনো সংঘর্ষ হলে বাণিজ্য, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা তীব্রভাবে বিঘ্নিত হবে —
এবং তার প্রভাব সরাসরি পড়বে বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে, বিশেষত পঞ্চগড় ও লালমনিরহাট অঞ্চলে।

বাংলাদেশের জন্য নীতিগত বিবেচনা

বাংলাদেশ এই করিডরের সরাসরি অংশ না হলেও, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় একে ‘নীরব অংশীদার’ বলা যায়।
নিজের স্বার্থ ও স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করতে পারে —

১. আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করা

BBINBIMSTEC কাঠামোর সক্রিয় সদস্য হয়ে বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক নৈকট্যকে অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপ দিতে পারে।
এটি শুধু বাণিজ্য নয়, আঞ্চলিক একীকরণেও ভূমিকা রাখবে।

২. সীমান্ত কূটনীতি মজবুত করা

ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল ও পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখলে করিডরের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।
এটি বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিবেশের জন্যও সহায়ক।

৩. বহিরাগত সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা

চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা যেন বেইজিংয়ের বিনিয়োগ থেকে লাভবান হয়, তবে ভারতের আস্থাও যেন অটুট থাকে —
এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে বাংলাদেশের প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

৪. উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন করা

পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলাগুলোর সড়ক, রেল ও স্থলবন্দর আধুনিকীকরণ করলে বাংলাদেশ কার্যকরভাবে আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনের অংশ হতে পারবে।

৫. মানবিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানো

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পর্যটন সহযোগিতা বাড়ানো গেলে ঐতিহাসিকভাবে টানাপোড়েনপূর্ণ এই অঞ্চলকে রূপ দেওয়া সম্ভব সহযোগিতার ভূখণ্ডে

রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের উত্তর সীমান্ত ঘেঁষা এই সিলিগুড়ি করিডর বা চিকেন নেক একদিকে সংযোগের প্রতীক, অন্যদিকে সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।

ভারতের জন্য এটি এক জীবনরেখা, বাংলাদেশের জন্য এটি এক ভূ-রাজনৈতিক সীমান্ত, আর সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি এক ভূগোলনির্ভর নিয়তির পরীক্ষা

এই করিডর যেমন দুর্বলতার প্রতীক, তেমনি সম্ভাবনারও ভাণ্ডার। দূরদর্শী পরিকল্পনা, বিশ্বাস ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে এটি একদিন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে রূপ নিতে পারে।

তবে সেই রূপান্তরের জন্য দরকার আস্থা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি — যা দক্ষিণ এশিয়া প্রায়ই হারিয়ে ফেলে।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই নিহিত চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা উভয়ই — নিজেকে স্থিতিশীলতার নোঙর হিসেবে ধরে রেখে, এই ভূগোলিক নৈকট্যকে কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করা — না হলে তা পরিণত হতে পারে এক নীরব দায়ে