চট্টগ্রামের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের প্রথম জানাজা আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম মহানগরীর জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। গত বুধবার সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৩ বছর বয়সে এই বর্ষীয়ান নেতার জীবনাবসান ঘটে।
Table of Contents
জানাজার আনুষ্ঠানিকতা ও শোকের আবহ
বৃহস্পতিবার সকালে মোশাররফ হোসেনের মরদেহ যখন জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে আনা হয়, তখন সেখানে এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। জানাজায় অংশ নিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ সমবেত হন। জানাজা শেষে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। মোনাজাতের পর কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন উপস্থিত রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। জানাজার পর মরদেহ তাঁর নিজ এলাকা মিরসরাইয়ের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত জনতার একটি অংশকে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়।
জানাজায় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি
জানাজায় অংশ নিয়ে সাবেক এই মন্ত্রীর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করেন উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতা শাহাদাত হোসেন জানাজায় উপস্থিত হয়ে তাঁর দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়নে মোশাররফ হোসেনের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নের স্বার্থে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে এই নেতার কর্মকালাপ মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
এছাড়াও জানাজায় বক্তব্য প্রদান করেন সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি শাহ আলম এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান। তাঁরা মহান মুক্তিযুদ্ধে মোশাররফ হোসেনের সাহসী ভূমিকা এবং সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী থাকাকালীন জনকল্যাণমূলক কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
মোশাররফ হোসেনের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও রাজনৈতিক পথচলা
মোশাররফ হোসেন ছিলেন একাধারে একজন প্রকৌশলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সফল উদ্যোক্তা। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| জন্ম ও বয়স | ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন; মৃত্যুকালে বয়স ছিল ৮৩ বছর। |
| শিক্ষাগত যোগ্যতা | প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। |
| রাজনৈতিক পরিচয় | সাবেক সংসদ সদস্য (মিরসরাই) এবং সাবেক মন্ত্রী। |
| দলীয় অবস্থান | আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সর্বশেষ সদস্য। |
| অন্যান্য ভূমিকা | মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বিশিষ্ট শিল্পপতি। |
| মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব | গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। |
কারাজীবন ও শারীরিক অসুস্থতা
মোশাররফ হোসেনের জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল আইনগত জটিলতা এবং শারীরিক অসুস্থতায় পূর্ণ। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টনে বিএনপি কার্যালয়ে হামলা ও কর্মী নিহতের মামলাসহ বেশ কিছু অভিযোগ ছিল। কারাগারে থাকাকালীন তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে সকল মামলায় আদালত থেকে জামিন লাভের পর তিনি কারামুক্ত হন। এরপর থেকেই তিনি শ্বাসকষ্ট ও বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এবং দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে আর্তি
জানাজা শেষে পরিবারের পক্ষ থেকে মোশাররফ হোসেনের জ্যেষ্ঠ পুত্র সাবেদুর রহমান সবার কাছে তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা ও দোয়া প্রার্থনা করেন। তিনি আবেগপূর্ণ কণ্ঠে বলেন যে, তাঁর বাবা আজীবন দেশ ও দশের কল্যাণে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর তাঁর মৃত্যুতে পরিবারের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি উপস্থিত সবাইকে অনুরোধ করেন যেন কেউ তাঁর বাবার আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকলে তা ক্ষমা করে দেন। জানাজা শেষে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি মিরসরাইয়ের পারিবারিক কবরস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, যেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
