ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) বহুল প্রতিক্ষিত বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটি পরিবেশ অধিদপ্তরের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর আমিনবাজারে অবস্থিত স্থায়ী বর্জ্য ল্যান্ডফিল পরিদর্শনকালে ডিএনসিসির নবনিযুক্ত প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জানান, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে আরও প্রায় দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে।
Table of Contents
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও প্রতিবন্ধকতা
প্রশাসক শফিকুল ইসলাম বলেন, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনতে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটির কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে পরিবেশগত ছাড়পত্র বা Environmental Clearance Certificate (ECC) না পাওয়ায় মূল নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে বর্জ্য পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন তাপমাত্রার মানদণ্ড নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। দ্রুতই কারিগরি সমাধান এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপনের মাধ্যমে এই জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
বর্তমানে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বর্জ্যের স্তূপ বিশাল আকার ধারণ করেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্যমতে, ল্যান্ডফিলটির নির্ধারিত ধারণক্ষমতা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। নিচে প্রকল্পের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
আমিনবাজার বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প একনজরে
| বিবরণ | তথ্যাদি |
| প্রকল্পের নাম | আমিনবাজার ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ (১ম সংশোধিত) |
| মোট বরাদ্দকৃত জমি | ৩০ একর (বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের জন্য) |
| মোট ল্যান্ডফিল এলাকা | ১০২ একর |
| প্রাক্কলিত ব্যয় | ১,২৭২ কোটি টাকা |
| বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা | ৪২.৫ মেগাওয়াট (প্রতি ঘণ্টায়) |
| টারবাইন সংখ্যা | ৪টি |
| প্রয়োজনীয় বর্জ্য | প্রতিদিন ৩,০০০ মেট্রিক টন |
| বর্তমান বর্জ্যের উচ্চতা | ৮০ ফুটের বেশি (প্রায় ৭ তলা ভবনের সমান) |
পরিবেশগত বিপর্যয় ও জনদুর্ভোগ
সরেজমিনে দেখা গেছে, আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে গৃহস্থালির বর্জ্য জমতে জমতে বিশাল পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। ল্যান্ডফিলের নিরাপদ উচ্চতা ৫০-৬০ ফুট হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা ৮০ ফুট ছাড়িয়ে গেছে। এখান থেকে নির্গত পচা তরল বা লিচেট আশপাশের কৃষি জমি ও জলাশয়ে মিশে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে।
বর্জ্য পোড়ানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশাসক জানান, সিটি কর্পোরেশন ইচ্ছাকৃতভাবে বর্জ্য পোড়ায় না। বর্জ্যের স্তূপ থেকে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন মিথেন গ্যাস বাতাসের সংস্পর্শে এসে অনেক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগুন ধরে যায়। রাতের বেলা এই আগুনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে বিষাক্ত ধোঁয়া লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় অসন্তোষ ও সংঘাত
দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনার কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। গত রোববার বিষাক্ত ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে পার্শ্ববর্তী কুন্দা গ্রামের বাসিন্দারা ল্যান্ডফিলে প্রতিবাদ জানাতে আসেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ল্যান্ডফিলের কার্যালয় এবং ভারী যন্ত্রপাতিতে ভাঙচুর চালায়। প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ল্যান্ডফিলটি পরিদর্শন করে স্থানীয়দের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনগণের কষ্ট কমাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৪ সাল থেকে যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল এবং ২০২৫ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। তবে বর্তমান অচলাবস্থা নিরসন করে দ্রুত কাজ শুরু করা এখন সময়ের দাবি।
