এবিএম জাকিরুল হক টিটন
“যার বন্ধু নেই সে দুর্ভাগা, আর যার সবাই বন্ধু তার কোনো বন্ধুই নেই”—এই প্রবাদবাক্যের মধ্যেই বন্ধুত্বের গভীর সত্য নিহিত। বন্ধুত্ব কখনো সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না; এটি গড়ে ওঠে মানসিক সামঞ্জস্য, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও দীর্ঘ সহযাত্রার ভিতের ওপর। মানুষের সামাজিক সত্তা তাকে সম্পর্কের দিকে টানে, কিন্তু প্রকৃত বন্ধুত্ব জন্ম নেয় সময়ের পরীক্ষায়, আস্থার বিনিময়ে এবং পারস্পরিক দায়বদ্ধতায়।
শৈশবের ধুলোমাখা মাঠ, স্কুলের বেঞ্চ, কলেজের করিডোর কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের তর্ক-বিতর্ক—এইসব মুহূর্তে জন্ম নেয় জীবনের সবচেয়ে নির্মল বন্ধন। একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, স্বপ্ন দেখা, ভুল করা, ব্যর্থ হওয়া এবং আবার ঘুরে দাঁড়ানো—এসব অভিজ্ঞতা বন্ধুত্বকে গভীর করে। বন্ধুত্ব কোনো চুক্তিনামা নয়; এটি নিঃস্বার্থ সমর্থন ও নির্ভরতার এক অদৃশ্য সেতুবন্ধ।
প্রবাদ আছে—অতিরিক্ত দহনেই সোনা খাঁটি হয়। তেমনি দুঃসময়ের আগুনেই বন্ধুত্বের সত্যতা প্রমাণিত হয়। প্রকৃত বন্ধু সেই, যার কাছে আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-ব্যর্থতা কিংবা নিজের দুর্বলতাও নির্দ্বিধায় প্রকাশ করা যায়। যে বন্ধুর গোপন কথা বাজারে ফেরি করে বেড়ায়, সে কখনো বন্ধুত্বের যোগ্য নয়। বন্ধুত্বে বিচার নেই, আছে বোঝাপড়া; নেই স্বার্থের হিসাব, আছে আন্তরিকতার পরিমাপ।
Table of Contents
মনীষীদের চোখে বন্ধুত্ব
প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ—অসংখ্য দার্শনিক ও চিন্তাবিদ বন্ধুত্বকে মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
| মনীষীর নাম | বন্ধুত্ব সম্পর্কে ভাবনা |
|---|---|
| উইলিয়াম শেক্সপিয়ার | ভালো বন্ধুর স্মৃতিই মানুষের পরম আনন্দ |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | বন্ধু গোলাপের মতো—বিশেষ এক মানবিক উপস্থিতি |
| এরিস্টটল | দু’টি দেহে এক আত্মার অবস্থানই বন্ধুত্ব |
| হযরত আলী (রা.) | প্রকৃত বন্ধু কল্যাণে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে |
| সক্রেটিস | বন্ধুত্ব পৃথিবীকে একত্রে ধরে রাখার সিমেন্ট |
| প্লেটো | বন্ধুদের মধ্যে থাকে ঐক্য |
| হেলেন কেলার | অন্ধকারে বন্ধুর সঙ্গে হাঁটাই উত্তম |
| অ্যালবার্ট আইনস্টাইন | শিল্প-বিজ্ঞানের মতো বন্ধুত্বও জীবনের সৌন্দর্য |
| মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র | বন্ধুর নীরবতা শত্রুর কথার চেয়েও বেশি স্মরণীয় |
| শেখ সাদি | আগন্তুকের বন্ধু হয় আরেক আগন্তুক |
| ফ্রিডরিখ নিটশে | বিশ্বস্ত বন্ধু জীবনরক্ষাকারী ছায়া |
এইসব উক্তির সারমর্ম একটিই—বন্ধুত্ব মানে আস্থা, দায়বদ্ধতা ও আত্মিক ঐক্য।
কর্মক্ষেত্র ও বন্ধুত্বের পার্থক্য
জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে অনেকেই সহকর্মীকেও ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেন। কিন্তু সহকর্মিতা ও বন্ধুত্ব এক নয়। কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা, আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্য থাকতে পারে; তবু সেখানে পেশাগত সীমারেখা ও স্বার্থের সূক্ষ্ম উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে হৃদয়ের অবাধ যাত্রাই মুখ্য।
নারী-পুরুষ বন্ধুত্ব
সমাজে নারী-পুরুষ বন্ধুত্ব প্রায়ই ভুল ব্যাখ্যার শিকার হয়। সন্দেহ, সামাজিক সংকোচ কিংবা প্রচলিত ধারণা অনেক সময় সম্পর্ককে সীমাবদ্ধ করে। অথচ বন্ধুত্বের মূল শর্ত হলো স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। যেখানে কোনো গোপন হিসাব নেই, সেখানেই নির্মল বন্ধুত্ব বিকশিত হয়।
স্মৃতি ও নস্টালজিয়া
দীর্ঘ কর্মজীবনের ক্লান্তি কিংবা সংসারের জটিলতার ভেতর হঠাৎই মনে পড়ে যায় শৈশবের সেই নির্ভার দিনগুলো। বগুড়া জিলা স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা সেই হারানো সময়কে ফিরে পাওয়ারই প্রয়াস। অগ্রজ-অনুজ ও পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণভরে আড্ডা—এ যেন জীবনের প্রকৃত সঞ্চয়। বাস্তবতার বাধা অনেক সময় সেই মিলনকে অসম্পূর্ণ করে দেয়; তবু স্মৃতির ভাণ্ডার অমলিন থাকে।
উপসংহার
বন্ধুত্ব কোনো বিলাসিতা নয়; এটি আত্মার প্রয়োজন। যার একজনও প্রকৃত বন্ধু আছে, সে প্রকৃত অর্থেই ধনী। আর যার চারপাশে অগণিত মানুষ, তবু হৃদয়ে শূন্যতা—সে নিঃস্ব।
বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে সময় লাগে, পরীক্ষিত বিশ্বাস লাগে। কিন্তু একবার গড়ে উঠলে তাকে যত্নে রক্ষা করতে হয়। কারণ সত্যিকারের বন্ধু হারানো মানে নিজের একটি অংশ হারানো। তাই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেও বন্ধুত্ব অটুট রাখা উচিত—কারণ এটি রাতারাতি অর্জনযোগ্য নয়, আর কোনো কিছুর বিনিময়ে প্রতিস্থাপনযোগ্যও নয়।
