চট্টগ্রামের অপরাধজগৎকে বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগে সারা বছর আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। নির্মাণাধীন ভবনের মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি, চাঁদা না পেলে গুলি চালানো, প্রকাশ্যে হত্যা—এ ধরনের ঘটনায় ২০২৫ সালের প্রতিটি মাসে বড় সাজ্জাদের নাম উঠে এসেছে। চলতি বছরের শুরুতে গতকাল শুক্রবারও নগরের চন্দনপুরা এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাসায় গুলিকাণ্ডে বড় সাজ্জাদের নাম এসেছে।
পুলিশ জানায়, সাজ্জাদ বিদেশে থাকলেও সহযোগীদের মাধ্যমে দেশে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। তার দলের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখনও অধিকাংশ সহযোগী অধরা। চট্টগ্রামের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, হাটহাজারী ও রাউজান এলাকায় পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে আছেন।
গত দেড় বছরে অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। কখনো আধিপত্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে, কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবে তারা এসব হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। যদিও সাজ্জাদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
কে এই বড় সাজ্জাদ
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর চালিতাতলী এলাকার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী। প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৯৯ সালে পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ডে। ২০০০ সালে ‘এইট মার্ডার’ হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। ২০০৪ সালে জামিনে কারাগার থেকে বের হয়ে তিনি বিদেশে পালান।
সাজ্জাদ আলীর দল শুরু হয় নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন ও আকবর আলীকে নিয়ে। এরপর সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ২০১৫ সাল থেকে দলের নেতৃত্ব নিয়েছেন। বর্তমানে বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ২৫ জন সক্রিয় সন্ত্রাসী রয়েছেন। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে থাকলেও ১৭ মামলার আসামি হিসেবে দেশীয় নেতৃত্ব সামলাচ্ছেন, তারপরে মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ইমন কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক প্রধান ঘটনায়:
| তারিখ | এলাকা | ঘটনা | আহত/মৃত | নোটস |
|---|---|---|---|---|
| ১ আগস্ট ২০২৫ | চান্দগাঁও মোহরা | ব্যবসায়ীর বাসায় গুলি | কেউ নিহত নয় | চাঁদা না পেয়ে হামলা |
| ২৩ মে ২০২৫ | পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত | আকবর আলীর প্রকাশ্যে হত্যা | নিহত ১ | বড় সাজ্জাদের সহযোগী |
| ৫ নভেম্বর ২০২৫ | বায়েজিদ বোস্তামী | সরোয়ার হোসেন হত্যা | নিহত ১, আহত ৫ | বিএনপি নেতা আহত |
| ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | রাউজান | যুবদল কর্মী আলমগীর আলম হত্যাচেষ্টা | নিহত ১ | রায়হানের নির্দেশে হামলা |
পুলিশ জানায়, ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি না মেনে ঘটানো অনেক হামলা সাজ্জাদের নির্দেশে হয়েছে। গত ১ আগস্ট চান্দগাঁওয়ে ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের বাসায় গুলিকাণ্ডের সময় বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে চাঁদার কথা বলা হয়েছিল।
ছোট সাজ্জাদ, রায়হান ও ইমনসহ দলীয় বেশিরভাগ সদস্য এখনও কারাগারে নেই। পুলিশের অভিযান অব্যাহত, ইন্টারপোলের মাধ্যমে বড় সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরানোর চেষ্টা চলছে। নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ জানান, “খুনের মামলার বেশির ভাগ আসামি ধরা পড়েছে। তবে বড় সাজ্জাদ ও তার প্রধান সহযোগীদের ধরার চেষ্টা চলছে।”
বিদেশে থাকা সাজ্জাদ আলী মুঠোফোনে প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, “আমি বিদেশে ব্যবসা করি, দেশে ভাড়া ঘর থেকে অর্থ আয় করি। আমাদের পরিবার বিত্তশালী। আমি কেন বাহিনী তৈরি করে খুন বা চাঁদাবাজি করব?”
চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই সন্ত্রাসী চক্রের সক্রিয়তা, অর্থসম্পর্ক ও হত্যাকাণ্ডের ধরণ নিয়ে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
