বাংলাদেশের ভাস্কর্য জগতে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী এক অনন্য ও স্বকীয় নাম। সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে নান্দনিক শিল্পসৃষ্টি তাঁর স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে শিল্প শুধু ধনদত্ত বা দামী উপকরণের বিষয় নয়; প্রকৃতি ও সাধারণ জীবনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেও তা গভীরভাবে প্রভাবশালী হতে পারে। তাঁর শিল্পকর্মে প্রকৃতি, জীবনসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং মানবিক বোধের প্রকাশ পাওয়া যায়।
Table of Contents
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সৈয়দ মাহবুবুল হক এবং মাতা রওশন হাসিনা। তিনি ১১ সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন।
শিক্ষাজীবন শুরু হয় খুলনার পাইওনিয়ার গার্লস স্কুলে, যেখানে তিনি এসএসসি পাশ করেন। এরপর খুলনা গার্লস স্কুল থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি অর্জন করেন।
ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবন
১৯৬৩ সালে প্রথমবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ১৯৭২ সালে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন আহসান উল্লাহ আহমেদ, একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা। দম্পতির ছয় সন্তান—তিন পুত্র ও তিন কন্যা।
১৯৭৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP), FAO, UNICEF এবং কানাডিয়ান দূতাবাস সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে সম্পূর্ণভাবে শিল্পচর্চায় মনোনিবেশ করেন।
শিল্পধারা ও অবদান
ফেরদৌসীর শিল্পধারা শুরু হয় গৃহসজ্জা ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন থেকে। তিনি ঝরা পাতা, শুকনো ডাল, গাছের গুঁড়ি এবং কাঠের টুকরো ব্যবহার করে ভাস্কর্য ও নান্দনিক শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন। এটি সাধারণ মানুষের কাছে শিল্পকে সহজলভ্য ও অনুপ্রেরণামূলক করে তোলে।
তাঁর শিল্পে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সৃজনশীল জীবনযাপন, প্রকৃতি ও মানব সম্পর্কের শিল্পী প্রতিফলন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং নারীর আত্মমর্যাদা প্রকাশিত হয়েছে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
| পুরস্কার / সম্মাননা | বছর / প্রদানকারী |
|---|---|
| স্বাধীনতা পুরস্কার | ২০১০, বাংলাদেশ সরকার |
| দ্য রিডার্স ডাইজেস্ট হিরো | ডিসেম্বর ২০০৪ |
| অনন্যা শীর্ষ পদক | — |
| রৌপ্য জয়ন্তী পুরস্কার (YWCA) | — |
| বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা পুরস্কার | — |
প্রয়াণ ও উত্তরাধিকার
৬ মার্চ ২০১৮ সালে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী প্রয়াণ করেন। তবে তাঁর শিল্পচর্চা আজও প্রাসঙ্গিক। সরলতার মধ্যেই সৌন্দর্য এবং প্রকৃতির মধ্যেই সৃষ্টির শক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি কেবল একজন ভাস্করই নন, তিনি সাহস, সৃজনশীলতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। তাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টিকর্ম বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ভান্ডারে চিরঅম্লান হয়ে থাকবে।
