জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুলাই ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফা তাদের বাণিজ্যিক স্বত্বে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার নতুন একটি পরিকল্পনা সামনে এনেছে। সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, এই বিশাল ব্যবসায়িক প্রস্তাবে রাজি না হলে সদস্য দেশগুলোকে বড় আকারের আর্থিক সুযোগ-সুবিধার হাতছাড়া হতে দেখতে হতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ফুটবল দেশের ক্ষেত্রে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৭০ কোটি টাকার সমপরিমাণ। মূলত নিজের স্বপ্নের এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সদস্য দেশগুলোর ওপর সরাসরি এক ধরনের কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছেন ফিফা সভাপতি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই অর্থনৈতিক কাঠামোর পক্ষে বা বিপক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সদস্য দেশগুলোকে সর্বমোট ৫৩ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ফিফার সদস্য দেশগুলোর ভোটাভুটিতে অনুমোদন পেলেই সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামের একটি সম্পূর্ণ নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন করবে।
নতুন এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে ফুটবল বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোর সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি এবং সব ধরনের বাণিজ্যিক অধিকার পরিচালনা করা হবে। এই বাণিজ্যিক কাঠামোতে বাইরের বেসরকারি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার সুযোগ রাখা হচ্ছে। জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সদস্য দেশগুলোকে নিশ্চয়তা দিয়েছেন, তাদের প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে ২০২৭ থেকে ২০৩১ অর্থবছরের চক্রে ফিফা ফরওয়ার্ড কর্মসূচির বার্ষিক অনুদান ৮ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। শুধু তা-ই নয়, প্রস্তাবের পক্ষে ইতিবাচক ভোট দেওয়া দেশগুলোকে এককালীন আরও ২০ মিলিয়ন ডলার বোনাস অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনাটি যদি ভোটাভুটিতে হেরে যায় বা কোনো দেশ এর বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তবে সেই সদস্য দেশটি অতিরিক্ত সুবিধা হারিয়ে স্বাভাবিক নিয়মে মাত্র ১০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আর্থিক অনুদান পাবে। অর্থাৎ, ইনফান্তিনোর এই বাণিজ্যিক পরিকল্পনার বিপক্ষে গেলে সরাসরি প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৭০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ফান্ড হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ বাফুফের মতো বা অন্য ছোট ফুটবল ফেডারেশনগুলো। দীর্ঘমেয়াদে এই অনুদান আরও বাড়িয়ে ২০৩৫-২০৩৮ চক্রে ২৪ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নেওয়ার চিন্তা রয়েছে ফিফার। সব মিলিয়ে নতুন এই বেসরকারি শেয়ারবাজার কাঠামোর মাধ্যমে ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাটি প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশের মতো এশীয় ও আফ্রিকান অঞ্চলের ক্ষুদ্র ফুটবল ফেডারেশনগুলো দেশের ফুটবল পরিচালনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, একাডেমি গড়ে তোলা এবং জাতীয় দলের ক্যাম্প পরিচালনায় ফিফার এই বার্ষিক অনুদানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইনফান্তিনো নিজেই এক বক্তব্যে উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘ফিফা যদি সরাসরি আর্থিক অনুদান না দেয়, তবে বিশ্বের প্রায় দেড় শতাধিক দেশে স্বাভাবিক ফুটবল কার্যক্রম টিকিয়ে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।’
তবে বিশ্ব ফুটবলে নতুন এই কোটি ডলারের উদ্যোগ ঘিরে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা উয়েফা সরাসরি অভিযোগ তুলে বলেছে, ফিফা মূলত অতিরিক্ত লাভের আশায় ফুটবলের মৌলিক ‘আত্মা বিক্রি’ করে দিতে চাইছে। এমন সংকটের মুখে ইউরোপের বিভিন্ন প্রভাবশালী ফুটবল কর্তারা জরুরি বৈঠকে বসছেন, এমনকি ইন্ডিপেনডেন্টের দাবি অনুযায়ী অনেকে বিশ্বকাপ বয়কটের মতো চরম পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা করছেন।
একইভাবে ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে, এমন একটি বড় সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাদের আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। তারা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নীতিগত অবস্থান নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছে। উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফও এই উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করেছে। তবে ইউরোপ ও কনকাকাফ আপত্তি জানালেও এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অধিকাংশ ছোট দেশের সমর্থন আদায় করে প্রস্তাবটি পাশ করাতে আশাবাদী ইনফান্তিনো। ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের অন্তত ৫০ শতাংশের সমর্থন এবং ফিফা কাউন্সিলের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই কার্যকর হবে বহুল আলোচিত এই পরিকল্পনা।
মন্তব্য