প্রাথমিক শিক্ষকদের স্বল্পসুদ ঋণ সুবিধা কৃষি ব্যাংকের

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সীমিত আয়ের মধ্যেই পরিবার পরিচালনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। অধিকাংশ শিক্ষক নিজ নিজ এলাকায় কর্মরত থাকায় তাঁদের পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক অংশগ্রহণ ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকতে হয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনেকেই গাভি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ, নার্সারি গড়ে তোলা কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার মতো উদ্যোগে যুক্ত হন। আবার সন্তানের উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা ব্যয় কিংবা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন মেটাতেও এককালীন বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন পড়ে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য একটি বিশেষ ঋণ কর্মসূচি চালু রেখেছে, যা স্বল্পসুদে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করছে।

বর্তমানে দেশে প্রায় পৌনে চার লাখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মরত আছেন। নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষকই কৃষি ব্যাংকের এ ঋণ কর্মসূচির আওতায় আসতে পারেন। মূলত বেতনের বিপরীতে অগ্রিম হিসেবে এই ঋণ প্রদান করা হয়, ফলে জামানতের জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম। এর মাধ্যমে শিক্ষকরা পরিবারিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করে আয় বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে একজন শিক্ষক সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। যেকোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, যিনি নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেন, তিনি এই ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে—আবেদনকারীকে অবশ্যই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হবে; তাঁর বেতন ও ভাতা যে কৃষি ব্যাংক শাখার মাধ্যমে প্রদান করা হয়, কেবল সেই শাখাতেই আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে; চাকরির মেয়াদ ন্যূনতম তিন বছর পূর্ণ হতে হবে এবং পিআরএলসহ অন্তত আরও তিন বছর চাকরির সময় অবশিষ্ট থাকতে হবে। এ ছাড়া আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনো বিচারাধীন মামলা, বিভাগীয় মামলা, ব্যাখ্যা তলব বা প্রশাসনিক কার্যক্রম চলমান থাকলে তিনি ঋণের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন।

বর্তমানে এ ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ, যা সময় ও নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। এককালীন ৫০০ টাকা প্রসেসিং ফি ধার্য রয়েছে। ঋণ বিতরণের পরবর্তী মাস থেকেই কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়। সর্বোচ্চ ৬০টি মাসিক কিস্তিতে অথবা চাকরির অবশিষ্ট মেয়াদকাল পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা শিক্ষকদের জন্য পরিশোধকে সহজ ও ব্যবস্থাপনাযোগ্য করে তোলে।

ঋণের পরিমাণ ও মেয়াদের ভিত্তিতে মাসিক কিস্তির একটি উদাহরণ নিচের টেবিলে দেওয়া হলো—

ঋণের পরিমাণমেয়াদমাসিক কিস্তি (টাকা)
১ লাখ১২ মাস৮,৭৪৫
১ লাখ২৪ মাস৪,৫৬৮
১ লাখ৩৬ মাস৩,১৮০
১ লাখ৪৮ মাস২,৪৮৯
১ লাখ৬০ মাস২,০৭৬
১০ লাখ১২ মাস৮৭,৪৫২
১০ লাখ২৪ মাস৪৫,৬৮৫
১০ লাখ৩৬ মাস৩১,৮০০
১০ লাখ৪৮ মাস২৪,৮৮৫
১০ লাখ৬০ মাস২০,৭৫৮

আবেদন প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত ফরম পূরণসহ ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনাপত্তি পত্র, বেতন–ভাতার সনদ, শৃঙ্খলাজনিত মামলা না থাকার প্রত্যয়ন এবং প্রয়োজনে বেতন থেকে কিস্তি কর্তনের নিশ্চয়তাপত্র জমা দিতে হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঋণ কর্মসূচি প্রাথমিক শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি তাঁদের স্বনির্ভর ও উৎপাদনমুখী উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।