পেট ফাঁপা এমন একটি সাধারণ হজমজনিত সমস্যা, যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে। পেটে টানটান ভাব, ভারী অনুভূতি কিংবা দৃশ্যমান স্ফীতি—এসবই এর সাধারণ লক্ষণ। অনেকেই মনে করেন অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত বা ভারী খাবারই একমাত্র কারণ। বাস্তবে বিষয়টি আরও বিস্তৃত। খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, হরমোনের ওঠানামা, এমনকি দ্রুত খাওয়ার অভ্যাসও পেট ফাঁপার জন্য দায়ী হতে পারে। কখনও কখনও অল্প পরিমাণ খাবার গ্রহণের পরও অস্বস্তি দেখা দেয়, যা দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটায়।
চিকিৎসাবিদদের মতে, মাঝেমধ্যে পেট ফাঁপা সাধারণত গুরুতর নয়। তবে এটি যদি নিয়মিত বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
Table of Contents
অতিরিক্ত আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ
মটরশুঁটি, মসুর ডাল, ব্রকলি ও বাঁধাকপির মতো খাবারে প্রচুর আঁশ ও গাঁজনযোগ্য শর্করা থাকে। এগুলো অন্ত্রের জন্য উপকারী হলেও হঠাৎ বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে অন্ত্রে গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যায়।
প্রতিকার:
আঁশ ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। প্রতিদিন অল্প অল্প করে বাড়ালে অন্ত্র মানিয়ে নিতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।
দুধজাত খাবারে অসহিষ্ণুতা
কিছু মানুষের শরীরে ল্যাক্টেজ নামক এনজাইমের ঘাটতি থাকে, ফলে দুধ, পনির বা আইসক্রিমে থাকা ল্যাক্টোজ ঠিকমতো হজম হয় না। অপরিপাকিত ল্যাক্টোজ অন্ত্রে গাঁজন সৃষ্টি করে, যার ফলে পেট ফাঁপা, গ্যাস ও কখনও পাতলা পায়খানা হয়।
প্রতিকার:
এক সপ্তাহের জন্য দুধজাত খাবার বন্ধ রেখে লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। উপসর্গ কমলে বিকল্প পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা উচিত।
মিষ্টি ও গ্যাসযুক্ত পানীয়
গ্যাসযুক্ত পানীয়ে দ্রবীভূত গ্যাস থাকে, যা পাকস্থলীতে জমে স্ফীতি সৃষ্টি করে। কৃত্রিম মিষ্টিকারকও অনেক সময় সম্পূর্ণ শোষিত হয় না এবং অন্ত্রে গাঁজন বাড়ায়।
প্রতিকার:
সাধারণ পানি বা ভেষজ চা পান করা ভালো। কৃত্রিম মিষ্টি সীমিত রাখতে হবে।
হরমোনজনিত পরিবর্তন
অনেক নারী মাসিকের আগে পেট ফাঁপার সমস্যায় ভোগেন। এ সময় হরমোনের পরিবর্তনে হজম ধীর হয় এবং শরীরে পানি জমে অস্বস্তি বাড়ে।
প্রতিকার:
লবণ কম খাওয়া, হালকা ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম উপকারী।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
মস্তিষ্ক ও হজমতন্ত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ অন্ত্রের স্বাভাবিক গতিশীলতা ব্যাহত করে, ফলে গ্যাস জমে থাকে।
প্রতিকার:
নিয়মিত ব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, পর্যাপ্ত ঘুম ও ধ্যান উপকারী হতে পারে।
দ্রুত খাবার গ্রহণ
খুব দ্রুত খেলে অতিরিক্ত বাতাস গিলে ফেলা হয় এবং খাবার ঠিকমতো চিবানো হয় না, যা হজমে সমস্যা সৃষ্টি করে।
প্রতিকার:
ধীরে ধীরে খাওয়া এবং ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
কারণ ও প্রতিকার সংক্ষেপে
| কারণ | শারীরিক প্রভাব | করণীয় |
|---|---|---|
| অতিরিক্ত আঁশ | অন্ত্রে গ্যাস বৃদ্ধি | ধীরে ধীরে আঁশ বাড়ানো |
| ল্যাক্টোজ অসহিষ্ণুতা | গ্যাস, অস্বস্তি | দুধজাত খাবার সাময়িক বর্জন |
| গ্যাসযুক্ত পানীয় | পাকস্থলীতে গ্যাস জমা | পানি বা ভেষজ চা পান |
| হরমোন পরিবর্তন | পানি জমা, ধীর হজম | লবণ কমানো, হালকা ব্যায়াম |
| মানসিক চাপ | অন্ত্রের গতি ব্যাহত | ধ্যান, ব্যায়াম, ঘুম |
| দ্রুত খাওয়া | বাতাস গেলা, অপাচ্যতা | ধীরে খাওয়া |
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন
পেট ফাঁপার সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা, বমি, অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার পরিবর্তনেই উপসর্গ কমে যায়, তবে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি।
সচেতন খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত শারীরিক চর্চা পেট ফাঁপা প্রতিরোধের মূলভিত্তি। কারণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকলে এবং সময়মতো ব্যবস্থা নিলে হজমজনিত স্বস্তি ও সামগ্রিক সুস্থতা অনেকাংশে নিশ্চিত করা সম্ভব।
