পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক নন: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

বাংলাদেশ থেকে অতীতে অসংখ্য রোহিঙ্গা নাগরিক ভুলবশত বা দুর্নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তবে পাসপোর্ট থাকা মানেই তারা বাংলাদেশের নাগরিক নন বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বুধবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। তিনি জানান, কয়েক দশক আগে হাতে লেখা পাসপোর্টের যুগে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের অভাব এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল।

অতীত ত্রুটি ও আন্তর্জাতিক চাপ

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের নিজেদের ভুলের কারণে অনেক বছর আগে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গেছেন। সেই সময় পাসপোর্টগুলো ছিল হাতে লেখা এবং তখন ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল।” বিশেষ করে সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার পাসপোর্ট নবায়ন নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার এক ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ চায় এই ব্যক্তিদের পাসপোর্ট বাংলাদেশ সরকার নবায়ন করুক।

উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ব্যাখ্যা করেন যে, জাতীয় স্বার্থের খাতিরে সরকার এই ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দিতে রাজি হয়েছে, তবে এটি কোনোভাবেই তাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি নয়। তিনি বলেন, “পাসপোর্ট থাকা মানেই এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বার্থ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কথা বিবেচনা করে আমাদের অনেক সময় এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।”

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমারের দায়বদ্ধতা

বাংলাদেশে বর্তমানে আশ্রয় নিয়ে থাকা প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার পূর্বপুরুষরা শত শত বছর ধরে মিয়ানমারে বসবাস করে আসছেন। বিশ্ব সম্প্রদায়ও তাদের রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন যে, যান্ত্রিক বা কারিগরি কোনো সমস্যা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনের পথে বাধা হতে পারে না।

নিচে রোহিঙ্গা সংকট ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত বর্তমান পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:

প্রসঙ্গের বিবরণবর্তমান পরিস্থিতি ও সরকারি অবস্থান
পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গার সংখ্যা (সৌদি আরব)প্রায় ৬৯,০০০ জন।
পাসপোর্ট ইস্যুর ঐতিহাসিক কারণহাতে লেখা পাসপোর্ট ও প্রশাসনিক দুর্নীতির সুযোগ।
নাগরিকত্বের অবস্থানপাসপোর্ট থাকলেও তারা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন না।
মোট রোহিঙ্গা জনসংখ্যা (বাংলাদেশ)প্রায় ১৩ লক্ষ।
প্রত্যাবাসনের মূল ভিত্তিতারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের আদি বাসিন্দা।
সরকারের কৌশলজাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে কারিগরি জটিলতা নিরসন করা।

ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

মার্কিন কূটনীতিকের ফাঁস হওয়া অডিও এবং যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি একে ‘অনুমাননির্ভর’ আলোচনা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “নির্বাচনে কে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসবে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বজায় রাখবে, তা সময়ই বলে দেবে। এখনই এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার কোনো অর্থ হয় না।”

এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের চীন সংক্রান্ত মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তিনি জানান, বাংলাদেশ তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি পরিষ্কার যে, রোহিঙ্গা সংকটের মতো জটিল মানবিক সমস্যার সমাধান এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য।