দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনায় বসার ইঙ্গিত যখন ওয়াশিংটন দিচ্ছে, ঠিক তখনই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে যে তারা ইরানের একটি সামরিক ড্রোন ভূপাতিত করেছে, অন্যদিকে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ধাওয়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মোতায়েন থাকা বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ইরানের একটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ এবং জাহাজে অবস্থানরত নাবিকদের জীবন রক্ষা করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। তারা জানায়, একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান সরাসরি রণতরী থেকেই উড্ডয়ন করে ড্রোনটিকে লক্ষ্য করে।
সেন্টকম আরও দাবি করে, ভূপাতিত হওয়া ড্রোনটি ছিল শাহেদ-১৩৯ মডেলের, যা ইরানের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থানরত মার্কিন রণতরীর দিকে দ্রুত ও ‘আগ্রাসী’ ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছিল। ড্রোনটির প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত তথ্য না পেলেও, উত্তেজনা কমাতে দেওয়া একাধিক সতর্ক সংকেত উপেক্ষা করেই সেটি জাহাজের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল বলে দাবি করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন বাহিনী পরিস্থিতিকে তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেয়।
ঘটনার পরপরই ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি আসেনি। তবে আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি ইরানি ড্রোনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগেই ড্রোনটি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও জানানো হয়।
ড্রোন ইস্যুর পাশাপাশি আরেকটি ঘটনায় উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। সেন্টকমের অভিযোগ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এম/ভি স্টেনা ইম্পেরেটিভকে ধাওয়া করে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। অভিযোগে বলা হয়, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দুটি দ্রুতগামী নৌকা ও একটি মোহাজের ড্রোন এতে অংশ নেয় এবং জাহাজটিতে উঠে সেটি দখলের হুমকি দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এ ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
অন্যদিকে ইরানের ফার্স সংবাদ সংস্থা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, জাহাজটি প্রয়োজনীয় আইনগত অনুমতি ছাড়া ইরানের আঞ্চলিক জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। সতর্ক করার পর জাহাজটি এলাকা ত্যাগ করে বলে তাদের দাবি। ফলে ইরানি কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাকে নিজেদের সার্বভৌম অধিকার রক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।
নিচের টেবিলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মূল দিকগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—
| বিষয় | যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য | ইরানের বক্তব্য |
|---|---|---|
| ড্রোন ভূপাতিত | আত্মরক্ষা ও রণতরীর নিরাপত্তার জন্য গুলি | ড্রোনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, তদন্ত চলছে |
| ড্রোনের অবস্থান | আন্তর্জাতিক জলসীমা | আন্তর্জাতিক জলসীমা |
| জাহাজ ধাওয়া | নৌকা ও ড্রোন দিয়ে দখলের হুমকি | অনুমতি ছাড়া আঞ্চলিক জলসীমায় প্রবেশ |
| কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট | আলোচনার ইঙ্গিতের মধ্যেই উত্তেজনা | সার্বভৌম অধিকার রক্ষার দাবি |
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুধু সামরিক উত্তেজনাই বাড়াচ্ছে না, বরং সম্ভাব্য কূটনৈতিক সংলাপের পথও জটিল করে তুলছে। পারস্য উপসাগরের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে সামান্য একটি ঘটনার প্রভাব যে কত দ্রুত আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা সমীকরণে প্রতিফলিত হতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারই বাস্তব উদাহরণ।
