পাকিস্তানের বিচারিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও লজ্জাজনক জালিয়াতির ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ইসলামাবাদের উচ্চ আদালতে বিচারপতির আসনে বসে গুরুত্বপূর্ণ সব রায় প্রদান করেছেন এক ব্যক্তি, যার আইন পেশার মূল ভিত্তি বা ওকালতি ডিগ্রিটিই ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের পর গত সোমবার ইসলামাবাদ হাইকোর্ট ১১৬ পৃষ্ঠার এক ঐতিহাসিক রায়ে সংশ্লিষ্ট বিচারপতি তারিক মাহমুদ জাহাঙ্গিরীকে পদচ্যুত করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আইনবিদ্যার কোনো বৈধ সনদ ছাড়াই তিনি উচ্চ আদালতের মতো সংবেদনশীল স্থানে আসীন হয়েছিলেন।
Table of Contents
জালিয়াতির শেকড় ও করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য
তদন্তে দেখা গেছে, তারিক মাহমুদ জাহাঙ্গিরীর পুরো শিক্ষাজীবনই ছিল সুপরিকল্পিত জালিয়াতির জালে ঘেরা। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের সরবরাহকৃত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে আদালত জানিয়েছে, জাহাঙ্গিরীর প্রতারণা শুরু হয়েছিল আশির দশকেই। ১৯৮৮ সালে তিনি একটি ভুয়া এনরোলমেন্ট নম্বর ব্যবহার করে এলএলবি পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সেখানে নকল করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করেছিল।
তবে দমে না গিয়ে জাহাঙ্গিরী পরের বছরই আরও বড় জালিয়াতির আশ্রয় নেন। তিনি ‘ইমতিয়াজ আহমেদ’ নামক এক প্রকৃত ছাত্রের এনরোলমেন্ট নম্বর চুরি করেন এবং নিজের নাম কিছুটা পরিবর্তন করে পুনরায় পরীক্ষায় বসেন। এমনকি সরকারি ইসলামিয়া ল কলেজের অধ্যক্ষ আদালতকে নিশ্চিত করেছেন যে, তারিক জাহাঙ্গিরী কখনোই তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ছাত্র হিসেবে ভর্তি হননি।
বিচারপতি জাহাঙ্গিরীর জালিয়াতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ
| বিষয়ের বিবরণ | তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও আদালতের পর্যবেক্ষণ |
| প্রাথমিক জালিয়াতি | ১৯৮৮ সালে ভুয়া এনরোলমেন্ট নম্বরে পরীক্ষা ও নকলের দায়ে বহিষ্কার। |
| পরিচয় চুরি | ১৯৮৯ সালে ইমতিয়াজ আহমেদ নামক ছাত্রের রোল নম্বর ব্যবহার। |
| প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি | সরকারি ইসলামিয়া ল কলেজের ছাত্র হিসেবে কোনো রেকর্ড নেই। |
| আইনি অবস্থান | এলএলবি ডিগ্রিটি শুরু থেকেই ‘বাতিল ও অকার্যকর’ ঘোষিত। |
| নিয়োগকাল | ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ। |
| চূড়ান্ত পরিণতি | ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদচ্যুতি ও বিচারিক ক্ষমতা হারানো। |
আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যর্থতা ও ছলচাতুরি
ইসলামাবাদ হাইকোর্ট তার রায়ে উল্লেখ করেছে যে, অভিযুক্ত জাহাঙ্গিরীকে তাঁর মূল নথিপত্র এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ পেশ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও একাধিক সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো বৈধ প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন। উল্টো বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে তিনি নানাবিধ ‘আইনি ছলচাতুরির’ আশ্রয় নেন। কখনো তিনি ফুল বেঞ্চ গঠনের দাবি তুলেছেন, কখনো বা প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ চেয়েছেন। এমনকি সিন্ধু হাইকোর্টে অন্য একটি মামলা ঝুলে থাকার অজুহাত দেখিয়ে শুনানি অনির্দিষ্টকালের জন্য পেছানোর আবেদনও করেছিলেন তিনি।
আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণ ও চূড়ান্ত রায়
আদালত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যেহেতু আবেদনকারী পক্ষ জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ পেশ করেছে, তাই নিজের যোগ্যতার সত্যতা প্রমাণের দায়ভার ছিল সম্পূর্ণ জাহাঙ্গিরীর ওপর। তা করতে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, তিনি একজন চরম জালিয়াতিপূর্ণ ব্যক্তি এবং আইনত বিচারপতি হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা তাঁর নেই।
উল্লেখ্য যে, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি শত শত মামলার রায় দিয়েছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর বিচারিক কার্যক্রমের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গত সোমবারের রায়ের মাধ্যমে তাঁকে চূড়ান্তভাবে অপসারিত করা হলো। এখন প্রশ্ন উঠেছে, একজন ভুয়া বিচারপতির দেওয়া বিগত পাঁচ বছরের রায়গুলোর আইনি বৈধতা নিয়ে, যা পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
