নুরাল পাগলার দরবারে হামলার ৬৮ দিন পর মামলা দায়ের

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে আলোচিত নুরাল পাগলার দরবারে হামলার ঘটনার ৬৮ দিন পর অবশেষে আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) নিহত নুরাল পাগলের শ্যালিকা শিরিন বেগম গোয়ালন্দ আমলী আদালতে এই অভিযোগ দায়ের করেন। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে আলোচিত ও উত্তেজনাপূর্ণ এই ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

মামলার আইনজীবী মো. শরিফুল ইসলাম জানান, আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়েছেন এবং প্রাথমিক তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)–কে নির্দেশ দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে মোট ৯৬ জনকে চিহ্নিত আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাত আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার বিষয়বস্তু ও আসামির সংখ্যার কারণে এটি একটি বড় ও সংবেদনশীল মামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, মামলায় দরবারে হামলা, ভাঙচুর, হত্যাকাণ্ড এবং সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছে। পিবিআই তদন্ত শুরু করলে ঘটনার নেপথ্য কারণ, পরিকল্পনা এবং জড়িতদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে নুরাল পাগলার দরবারে হামলা ও রাসেল মোল্লা হত্যার ঘটনায় একটি মামলা দায়ের হয়েছিল। ওই মামলার বাদী ছিলেন নিহত রাসেলের বাবা দেবগ্রাম ইউনিয়নের সাবেক সদস্য আজাদ মোল্লা। তিনি গোয়ালন্দ ঘাট থানায় দায়ের করা মামলায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করেছিলেন। পুলিশ ওই মামলায় তদন্ত চালিয়ে এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এ ছাড়া ৬ সেপ্টেম্বর পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় আরেকটি মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় ৩ হাজার ৩৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পুলিশ জানায়, এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুটি মামলাই বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৫ সেপ্টেম্বর। সেদিন গোয়ালন্দ বাজারে জুমার নামাজের পর একটি বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে একদল উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি নুরাল পাগলার দরবারে হামলা চালায়। এ সময় দরবার এলাকায় ব্যাপক ভাঙচুর হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। এ ছাড়া পুলিশের দুটি গাড়ি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা নুরাল পাগলার কবরস্থান এলাকায়ও সহিংস আচরণ করে এবং মর্যাদাহানিকর কর্মকাণ্ড চালায়। পুরো ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ধর্মীয় ও সামাজিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। হামলার সময় নিহত হন রাসেল মোল্লা, যিনি দেবগ্রাম ইউনিয়নের সাবেক সদস্য আজাদ মোল্লার ছেলে।

এই দীর্ঘ সময় পর নতুন করে আদালতে মামলা হওয়ায় আইনগত প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল সংখ্যক আসামি ও একাধিক মামলার কারণে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে। তবে পিবিআইয়ের মতো বিশেষায়িত সংস্থার তদন্তে ঘটনার প্রকৃত তথ্য উঠে আসবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।

এলাকাবাসীর একাংশ মনে করছেন, এতদিন পর মামলা হলেও ন্যায়বিচারের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তারা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের সহিংসতা আর না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।