মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন দানশীলতা, মানবপ্রেম ও সমাজসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি কেবল একজন সফল হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ব্যবসায়ীই নন, বরং নিজের উপার্জিত অর্থ সম্পূর্ণভাবে মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করার বিরল আদর্শে উজ্জ্বল এক মহৎ ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিগত ভোগবিলাস বা খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ দূরে। নীরবে, নির্লোভভাবে এবং আজীবন সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখাই ছিল তাঁর জীবনের মূল সাধনা।
১৮৫৮ সালের ১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বিটঘর গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা ঈশ্বরদাস তর্কসিদ্ধান্ত ছিলেন একজন বিদ্বান পণ্ডিত এবং মাতা রামমালা দেবী ধর্মপরায়ণ ও মানবিক গুণে সমৃদ্ধা। এই পারিবারিক পরিবেশই তাঁর চরিত্রে জ্ঞানানুরাগ, সংযম ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার বীজ রোপণ করে।
চরম দারিদ্র্যের কারণে মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। তবুও শিক্ষালাভের আকাঙ্ক্ষা তাঁকে থামাতে পারেনি। আত্মশিক্ষার মাধ্যমে তিনি জ্ঞানার্জন করেন এবং একসময় বঙ্গ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—প্রাতিষ্ঠানিক সনদ নয়, মনোবল ও অধ্যবসায়ই মানুষের প্রকৃত শক্তি।
১৮৮৩ সালে মাত্র ৫৫ টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি কলকাতায় গমন করেন এবং হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ব্যবসা শুরু করেন। সততা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অল্প সময়েই তিনি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হন। কিন্তু এই সাফল্য তিনি নিজের জন্য সঞ্চয় করেননি। বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবকল্যাণ ও তীর্থযাত্রীদের সুবিধার্থে ব্যয় করাকেই তিনি জীবনের প্রধান কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। পিতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে তিনি ১৯২৩ সালে কুমিল্লা শহরে ঈশ্বর পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করেন। নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয় ও নিবেদিতা ছাত্রীনিবাস। ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রামমালা ছাত্রাবাস এবং ১৯৩৫ সালে রামমালা গ্রন্থাগার। নিজ গ্রামে তিনি শিক্ষা সংসদ স্থাপন করেন এবং কাশীধামে প্রতিষ্ঠা করেন ঈশ্বর পাঠশালা টোল।
মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো—নিজ গ্রামে একটি পুকুর খনন, যেখানে জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের পানীয় জল গ্রহণের অধিকার ছিল। তীর্থভ্রমণের সময় বৈদ্যনাথে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি প্রতিদিন প্রায় চার থেকে পাঁচশো মানুষকে অন্নদান করতেন, তাও সম্পূর্ণ নীরবে ও প্রচারবিমুখভাবে।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো—
| বছর | প্রতিষ্ঠানের নাম | উদ্দেশ্য |
|---|---|---|
| ১৯২০ | রামমালা ছাত্রাবাস | ছাত্রদের আবাসন |
| ১৯২৩ | ঈশ্বর পাঠশালা | প্রাথমিক শিক্ষা |
| ১৯৩৫ | রামমালা গ্রন্থাগার | জ্ঞানচর্চা |
| ১৯৩৫ | কালীঘাট যাত্রীনিবাস | তীর্থযাত্রী সেবা |
| অজানা | হরসুন্দরী ধর্মশালা (বারানসী) | ধর্মীয় আশ্রয় |
ব্যবসার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চাতেও মনোনিবেশ করেন। ১৩১২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ ‘ব্যবসায়ী’ তৎকালীন সমাজে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করে। এছাড়া তাঁর আত্মজীবনী ‘আত্মকথা’ গ্রন্থে তিনি নিজের সংগ্রামী জীবনের কথা লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
১৯৪৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এই মহান দানবীর ইহলোক ত্যাগ করেন। তবে তাঁর কর্ম, আদর্শ ও মানবপ্রেম আজও জীবিত—মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসার অনন্ত অনুপ্রেরণা হয়ে।
