নির্ভীক কলমযোদ্ধা পীর হাবিবুর রহমান: স্মৃতিতে অমলিন এক জীবন-উপাখ্যান

বাংলার সাংবাদিকতা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, তীক্ষ্ণ লেখনীর জাদুকর পীর হাবিবুর রহমানের প্রয়াণের আজ চার বছর। চার বছর আগে এই দিনে (৫ ফেব্রুয়ারি) তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর স্মৃতি, আদর্শ এবং সাহসী লেখনী আজও পাঠক হৃদয়ে সজীব। বৈরী স্রোতের বিপরীতে আজীবন সাঁতার কেটে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো এই মানুষটি ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, কলামিস্ট, সাহিত্যিক এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক।

    WhatsApp Image 2026 02 05 at 1.18.54 AM 2 নির্ভীক কলমযোদ্ধা পীর হাবিবুর রহমান: স্মৃতিতে অমলিন এক জীবন-উপাখ্যান

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষার হাতেখড়ি

১৯৬৩ সালের ১২ নভেম্বর জল-জোছনার শহর সুনামগঞ্জে পীর হাবিবুর রহমানের জন্ম। বাবা মরহুম রইস আলী পীর ও মা সৈয়দা রহিমা খানমের সপ্তম সন্তান ছিলেন তিনি। শৈশব থেকেই অত্যন্ত দুরন্ত ও ডানপিটে পীর হাবিব কৈশোরেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। সুনামগঞ্জের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি সরকারি জুবলী স্কুল থেকে এসএসসি এবং সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। সেখান থেকেই তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের হাতেখড়ি হয় ১৯৮৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে।

WhatsApp Image 2026 02 05 at 1.18.54 AM 1 1 নির্ভীক কলমযোদ্ধা পীর হাবিবুর রহমান: স্মৃতিতে অমলিন এক জীবন-উপাখ্যান

কর্মজীবন ও সাংবাদিকতায় স্বকীয়তা

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঢাকায় এসে পীর হাবিবুর রহমান নিজেকে পুরোপুরি সাংবাদিকতায় বিলিয়ে দেন। তাঁর সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য মাইলফলকগুলো নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

সময়কাল/প্রতিষ্ঠানভূমিকা ও অবদান
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়১৯৮৪ সালে প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; সাংবাদিকতার সূচনা।
বাংলাবাজার ও যুগান্তরকর্মজীবনের শুরুর দিককার গুরুত্বপূর্ণ সময়; লেখনীর ধার বৃদ্ধি।
আমাদের সময়প্রথাভাঙা ও সাহসী কলামের মাধ্যমে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি।
বাংলাদেশ প্রতিদিননির্বাহী সম্পাদক হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন ও জনপ্রিয় কলাম লিখন।
অন্যান্য মাধ্যমজনপ্রিয় টিভি টকশো ব্যক্তিত্ব এবং সফল কথাসাহিত্যিক।

adwdawda 1 নির্ভীক কলমযোদ্ধা পীর হাবিবুর রহমান: স্মৃতিতে অমলিন এক জীবন-উপাখ্যান

অদম্য সাহস ও সৃজনশীল সত্তা

পীর হাবিবুর রহমানের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অপ্রিয় সত্য বলার সাহস। তাঁর শব্দ চয়ন ছিল ছান্দিক ও ঝংকৃত। তিনি বিশ্বাস করতেন, হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ছাড়া প্রকৃত লেখক বা সাংবাদিক হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মন জুড়ে ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রেম, চেতনায় ছিল নজরুলের বিদ্রোহ এবং হৃদয়ের গহীনে লালনের দর্শন। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সোজাসাপ্টা ও নির্ভীক। বৈরী পরিস্থিতিতেও তিনি নিজের আদর্শ ও বিশ্বাসের জায়গা থেকে এক চুলও নড়েননি।

WhatsApp Image 2026 02 05 at 1.18.52 AM 1 নির্ভীক কলমযোদ্ধা পীর হাবিবুর রহমান: স্মৃতিতে অমলিন এক জীবন-উপাখ্যান

পারিবারিক জীবন ও সংগ্রামের দিনগুলো

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৯৩ সালে তিনি ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপুর কন্যা ডায়না নাজরীনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে রয়েছে দুই সন্তান—পুত্র আহনাফ ফাহমিন অন্তর ও কন্যা রাইসা নাজ চন্দ্রস্মিতা। করোনাকালের শুরুতে তিনি মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হন। বোনমেরু ট্রান্সপ্লান্টসহ দীর্ঘ ও জটিল চিকিৎসার মধ্য দিয়ে তিনি ক্যানসারকে জয় করেছিলেন। কিন্তু বিধাতা হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিলেন; রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত করোনার কাছে পরাজিত হতে হয় এই বীর যোদ্ধাকে।

adawdadawdawdw 1 নির্ভীক কলমযোদ্ধা পীর হাবিবুর রহমান: স্মৃতিতে অমলিন এক জীবন-উপাখ্যান

বিদায় ও চিরস্থায়ী সম্মান

২০২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা ৮ মিনিটে পীর হাবিবুর রহমান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণের পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু করে জাতীয় প্রেস ক্লাব এবং তাঁর জন্মভিটা সুনামগঞ্জ—সর্বত্রই সাধারণ মানুষ ও সহকর্মীদের ঢল নেমেছিল। ছয়টি জানাজা শেষে নিজের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী সুনামগঞ্জে বাবা-মায়ের কবরের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

পীর হাবিবুর রহমান আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া অসংখ্য কলাম, উপন্যাস এবং সাহসী সাংবাদিকতার আদর্শ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যে স্বপ্ন তিনি দেখতেন, তা বাস্তবায়নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকবে তাঁর প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা।