নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: জুলাইয়ে লুট হওয়া পুলিশের বন্দুক-গুলি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক বছর আগে পুলিশের সংরক্ষণাগার থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলির বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারকারীদের জন্য পুরস্কার ঘোষণার পরও উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। এদিকে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠছে, বিশেষত আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্ত্রের সক্রিয়তা ও রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা আরও তীব্র হয়েছে।

গত জুলাইয়ে হারানো অস্ত্রের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৭৫টি এবং গুলি ছিল প্রায় ২ লাখ ৫৮ হাজার। পুরস্কার ঘোষণার পর তিন মাসে উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৯০ রাউন্ড গুলি। ফলে এখনো ১ হাজার ৩৪০টির বেশি অস্ত্র এবং দুই লাখেরও অধিক গুলির অস্তিত্ব অজানা। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে রাইফেল, সাব-মেশিনগান (এসএমজি), লাইট মেশিনগান (এলএমজি), পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান এবং টিয়ারগ্যাস লঞ্চার, যা অপরাধীচক্রের হাতে গেলে বড় ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

লুট হওয়া অস্ত্র ও উদ্ধার অগ্রগতি

উপকরণমোট লুটউদ্ধারের পরিমাণএখনো নিখোঁজ
আগ্নেয়াস্ত্র১,৩৭৫টি৩৫টি১,৩৪০+
গুলি২,৫৭,৮৪৯ রাউন্ড১৯০ রাউন্ড২,৫৭,৬৫৯+

অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের উদাহরণ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। রাজধানীর মতিঝিলে রাজনৈতিক নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ও খুলনায় মোতালেব শিকদার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। শুধু গত ১৪ মাসে যশোর, চট্টগ্রাম, খুলনা, গাজীপুর, নারায়াণগঞ্জসহ দেশের ২০ জেলায় অবৈধ অস্ত্রের গুলিতে ৫০০-র বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধীরা ব্যবহার করছে বা ভাড়া দিচ্ছে—এমন তথ্যও পাওয়া গেছে। নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করতে এই অস্ত্র বড় ভূমিকা নিতে পারে।”

সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন অস্ত্র লাইসেন্স স্থগিত করেছে। তবে আগস্টের পর ঢাকায় প্রায় ৪৫টি নতুন লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, যা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সরকার ১৭ হাজার ২০০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেয়। চাপে পড়ে ১৩ হাজার ৩৪০টি জমা হলেও ৩ হাজার ৮৬০টি অস্ত্র এখনো ফেরত আসেনি। পরে ১ হাজার ১৭৭টি লাইসেন্স বাতিল করা হয়—যার মধ্যে ঢাকায় সর্বোচ্চ ৭৯৬টি।

অনেক লাইসেন্সধারী দেশ ছেড়েছেন বা আত্মগোপনে আছেন বলে জানায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কেউ কেউ দাবি করেছেন আন্দোলন-অস্থিরতার সময় অস্ত্র হারিয়ে গেছে। নাম প্রকাশিত তালিকায় আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার নামও রয়েছে যারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অস্ত্র জমা দেননি।

নির্বাচনের ঠিক আগে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র গায়েব হয়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তা, নির্বাচনী সহিংসতা ও সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—সময়ের মধ্যে এসব অস্ত্র উদ্ধার না হলে ভোটকেন্দ্র, প্রচারসভা ও সড়কে অরাজকতা বাড়তে পারে। ফলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।