নিরাপত্তার অজুহাতে গোপনে দেশ ছাড়লেন রামপাল প্রকল্পের ৯ শীর্ষ কর্মকর্তা

বাগেরহাটের রামপালে অবস্থিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সুপার তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রশাসনিক ও কারিগরি বিভাগে কর্মরত ৯ জন উচ্চপদস্থ ভারতীয় কর্মকর্তা রহস্যজনকভাবে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন। শনিবার (২৪ জানুয়ারি, ২০২৬) ভোরে কাউকে কিছু না জানিয়ে এবং কর্তৃপক্ষের কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়াই তাঁরা গোপনে বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে ফিরে যান। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের এমন আকস্মিক প্রস্থান প্রকল্প এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও প্রশাসনিক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

প্রস্থান ও শনাক্তকরণের ঘটনাক্রম

তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের সূত্রমতে, প্রতিদিনের মতো শনিবার সকালেও কর্মকর্তাদের নাস্তার টেবিলে সমবেত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ওই ৯ জন কর্মকর্তার কাউকে পাওয়া না যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ তাঁদের আবাসস্থলে খোঁজ শুরু করে। এক পর্যায়ে জানা যায়, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই এলাকা ত্যাগ করেছেন। পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তাঁরা সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারত প্রবেশ করেছেন। এই ৯ জন কর্মকর্তাই ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) থেকে প্রেষণে রামপাল প্রকল্পে দায়িত্বরত ছিলেন।

দেশ ত্যাগকারী কর্মকর্তাদের পদবি ও পরিচয়:

পদের নামকর্মকর্তাদের নাম
জেনারেল ম্যানেজার (GM)প্রতিম ভর্মন, বিশ্বজিৎ মণ্ডল ও এন সুরায়া প্রকাশ রায়।
সিএফও (CFO)ইমানুয়েল পনরাজ দেবরাজ।
সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (AGM)কেশবা পালাকি ও পাপ্পু লাল মিনা।
ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (DGM)সুরেয়া কান্ত মন্দেকার, সুরেন্দ্র লম্বা ও অনির্বাণ সাহা।

নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

প্রকল্প পরিচালক রামানাথ পুজারী এবং উপমহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) আনোয়ারুল আজিম জানান, কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরবর্তীতে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা ‘নিরাপত্তাঝুঁকি’র কথা উল্লেখ করেন। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ এই দাবিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে। তাঁদের মতে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে বর্তমানে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর সমন্বয়ে একটি নিশ্ছিদ্র চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা বিদ্যমান। এর আগে ওই কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত বা পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে কখনো কোনো শঙ্কা বা অভিযোগ জানাননি। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ গোপনে দেশ ছাড়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের কাছে গভীর রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান পরিস্থিতি একনজরে:

তথ্যের বিবরণবর্তমান অবস্থা ও মন্তব্য
নিরাপত্তা ব্যবস্থাচার স্তরবিশিষ্ট (সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও নিজস্ব গার্ড)।
প্রস্থানের রুটসাতক্ষীরা সীমান্ত (সড়কপথ)।
প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়াঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিতকরণ ও তদন্ত কমিটি গঠন।
উৎপাদন কার্যক্রমবিকল্প উপায়ে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।
আইনি অবস্থানঅনুমতিহীন প্রস্থানকে চাকরি বিধিমালার লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রহস্য ও সম্ভাব্য কারণ

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, কর্মকর্তাদের এই আকস্মিক প্রস্থানের পেছনে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অথবা তাঁদের মূল প্রতিষ্ঠান (NTPC) থেকে কোনো বিশেষ অভ্যন্তরীণ বার্তা থাকতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়াই একটি আন্তর্জাতিক প্রকল্পের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কর্মস্থল ত্যাগ কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তাঁরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বা কারিগরি ডেটা সাথে নিয়েছেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উপসংহার

রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থাপনায় উচ্চপদস্থ বিদেশি কর্মকর্তাদের এমন আচরণ প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ঘটনার পর থেকে কেন্দ্র এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চলমান রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদে বিদেশি কর্মীদের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ ভবিষ্যতে এ ধরণের প্রকল্পে জনবল নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।