নারায়ণগঞ্জে দুই শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ, মানবেতর জীবন শ্রমিকদের

ব্যাংকের সহায়তা না পাওয়া, কাস্টমস জটিলতা, বিদেশি বায়ারদের অনাগ্রহ, শ্রমিক অসন্তোষ ও জ্বালানি সংকটসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে গত দুই বছরে নারায়ণগঞ্জে রপ্তানিমুখী দুই শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন লক্ষাধিক শ্রমিক। চলতি অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি খাতে দেড় বিলিয়ন ডলার লোকসান হয়েছে।

এ অবস্থায় চালু থাকা কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন মালিকরা। দ্রুত বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করে শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে আনা না গেলে অপরাধ প্রবণতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সংকট মোকাবিলার আশ্বাস দিয়েছে জেলা কলকারখানা দপ্তর এবং বিকেএমইএ।

নীট পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ’র তথ্যমতে, সারা দেশের মোট নীট পোশাক রপ্তানির ৪০ শতাংশই আসে নারায়ণগঞ্জ থেকে। তবে রাজনৈতিক সহিংসতা, ডলারের দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট, ব্যাংকের ঋণ জটিলতা ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে গত দুই বছরে বিকেএমইএ ও বিজিএমইএ’র অন্তর্ভুক্ত অন্তত শতাধিক রপ্তানিমুখী কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক শ্রমিক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিকেএমইএ ও বিজিএমইএ’র বাইরে মাঝারি আকারের আরও শতাধিক রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের দাবি—দ্রুত এসব কারখানা চালু করে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরিয়ে না আনলে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটতে পারে।

গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি এম এ শাহীন গণমাধ্যমকে জানান, গত দুই বছরে দুই থেকে আড়াইশ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়েছেন। জীবিকার তাগিদে কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ ফুটপাতে হকারগিরি করছেন—কিন্তু সেখানেও নানা বাধার মুখে পড়ছেন। তার মতে, সরকারের উচিত দ্রুত বন্ধ কারখানাগুলো চালু করার উদ্যোগ নেওয়া। না হলে অনেক শ্রমিক অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন, এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

এ বিষয়ে শ্রমিকদের আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা উপমহাপরিদর্শক রাজীব চন্দ্র ঘোষ। তিনি বলেন, মালিকপক্ষ আগে থেকে জানায় না; হুট করেই কারখানা বন্ধ করে দেয়। শ্রমিকরা আন্দোলনে নামলে তারা বিষয়টি জানতে পারেন এবং ব্যবস্থা নেন। বকেয়া বেতন নিয়ে অভিযোগ দিলে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করা হয়। মালিক বেতন না দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

বর্তমান সংকটে চালু কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফতুল্লার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা নীট রেডিক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, গত দুই বছরে প্রায় ২০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। ব্যাংকগুলো সহযোগিতা করছে না, কাস্টমসে জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা এবং বিদেশি বায়ারদের অর্ডার কমে যাওয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ অর্ডার কমে গেছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠান চালু রাখা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।

বিকেএমইএ’র তথ্য বলছে, নারায়ণগঞ্জে সহস্রাধিক কারখানার মধ্যে বর্তমানে চালু আছে মাত্র ৩৫০টি। গত অর্থবছরে এখান থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল, আর চলতি বছরে রপ্তানি নেমে এসেছে সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ লোকসান হয়েছে দেড় বিলিয়ন ডলার। জিডিপিও সাড়ে ৫ শতাংশ থেকে নেমে সাড়ে ৪ শতাংশে এসেছে। এতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ছে।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গার্মেন্ট শিল্প এখন চরম হুমকির মুখে। অধিকাংশ কারখানা আইসিইউ রোগীর মতো টিকে আছে। ব্যাংকগুলো সহযোগিতা করছে না। এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংককে বড় ভূমিকা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও রিসিডিউলিং ছাড়া ফ্যাক্টরি টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রয়োজনে ১০ থেকে ২০ বছরের জন্য লং টার্ম সাপোর্ট দিতে হবে।

এসএস