নান্দাইলের মিলি: বারুইগ্রাম থেকে সিডনির সবুজ গ্যালারিতে অভিষেক

বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদ থেকে বিশ্বমঞ্চে উঠে আসার গল্পগুলো বরাবরই রোমাঞ্চকর। তেমনই এক অবিস্মরণীয় গল্পের নাম মিলি আক্তার। ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের বারুইগ্রামের এক জীর্ণ কুটির থেকে উঠে এসে তিনি এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনির সিডনি ফুটবল স্টেডিয়ামে। গতকাল ৩ মার্চ এএফসি নারী এশিয়ান কাপের মূল আসরে চীনের বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ম্যাচে জাতীয় দলের গোলরক্ষক হিসেবে অভিষেক হয়েছে এই অদম্য লড়াকুর।

অভিষেকের রোমাঞ্চ ও চীনের প্রাচীর হওয়া

রেকর্ড নয়বারের এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে বাংলাদেশ ২-০ গোলে পরাজিত হলেও পুরো ম্যাচে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন মিলি আক্তার। চীনের শক্তিশালী ফরোয়ার্ড লাইনের একের পর এক আক্রমণ যেভাবে তিনি রুখে দিয়েছেন, তাতে ফুটবল বিশ্লেষকদের চোখে তিনি ছিলেন ‘চীনের প্রাচীরের বিপরীতে বাংলাদেশের ঢাল’। সিডনি থেকে মুঠোফোনে মিলি জানান, প্রথম ম্যাচে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করলেও ২-০ গোলের পরাজয় তাকে কিছুটা অতৃপ্ত রেখেছে। তবে সামনের ম্যাচগুলোতে গোলবারের সামনে নিজেকে আরও দুর্ভেদ্য করে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।


মিলি আক্তারের জীবনের সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল ও সাফল্য

বিষয়তথ্য ও বিবরণ
পুরো নামমিলি আক্তার
জন্মস্থানবারুইগ্রাম, নান্দাইল, ময়মনসিংহ।
পারিবারিক অবস্থাবাবা কলা বিক্রেতা, মা গৃহিণী। বসবাস সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে।
পেশাবাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গোলরক্ষক ও জাতীয় ফুটবলার।
সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনদক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলরক্ষক এবং একুশে পদক লাভ।
এশিয়ান কাপ অভিষেক৩ মার্চ, ২০২৬ (প্রতিপক্ষ: চীন)।
সাফল্যের মূল ভিত্তিঘরোয়া ফুটবল ও সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে নজরকাড়া পারফরম্যান্স।

সংগ্রাম ও সাফল্যের বন্ধুর পথ

মিলির এই পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তার বাবা মো. সামছুল হক স্থানীয় বাজারে কলা বিক্রি করে সংসার চালান। দরিদ্রতার কশাঘাতে জর্জরিত পরিবারটি বর্তমানে সরকার প্রদত্ত উপহারের ঘরে বসবাস করছে। ২০২২ সালে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের অনবদ্য নৈপুণ্যের পর মিলির ভাগ্য বদলাতে শুরু করে। ফুটবল প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাকে চাকরিতে নিয়োগ দেয়, যা তার পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার পথ প্রশস্ত করে। পরিশ্রম আর মেধার জোরে তিনি গত বছর দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলরক্ষকের খেতাব অর্জন করেন এবং সম্মানজনক ‘একুশে পদক’ লাভ করেন।

নান্দাইলের জয়যাত্রা ও আগামীর লক্ষ্য

সিডনির মাঠে মিলির এমন রাজকীয় অভিষেক নান্দাইলবাসীর মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে। বাবা সামছুল হক খুশিতে আত্মহারা হয়ে এলাকাবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, এবারের এশিয়ান কাপ স্কোয়াডে কেবল মিলি নন, নান্দাইলের আরও দুই কৃতি কন্যা হালিমা আক্তার ও সৌরভী আকন্দ প্রীতি জায়গা করে নিয়েছেন। এটি নান্দাইলকে দেশের নারী ফুটবলের নতুন পাওয়ার হাউজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রতিপক্ষ উত্তর কোরিয়া এবং উজবেকিস্তান। অভিজ্ঞতা ও র্যাঙ্কিংয়ের দিক থেকে তারা বাংলাদেশের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে থাকলেও চীনের বিপক্ষে মিলি-প্রীতিদের অসম সাহসী লড়াই ফুটবলপ্রেমীদের মনে আশার সঞ্চার করেছে। মিলির লক্ষ্য এখন একটাই—বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা আরও উঁচুতে তুলে ধরা এবং উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ক্লিন শিট (কোনো গোল না খাওয়া) বজায় রাখা।