নাট্যাঙ্গনে শোকের ছায়া: না ফেরার দেশে আতাউর রহমানদেশের বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব, অভিনেতা ও মঞ্চনির্দেশক আতাউর রহমান আর নেই। টানা দশ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর সোমবার দিবাগত রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আগামী জুনে তাঁর ৮৫তম জন্মদিন পালনের কথা ছিল। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।
আতাউর রহমানের মেয়ে শর্মিষ্ঠা রহমান গণমাধ্যমকে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ শহীদ মিনারে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাঁকে বনানী কবরস্থানে তাঁর স্ত্রীর কবরের পাশেই দাফন করা হবে। বাদ জোহর দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
গত ১ মে বাসায় পড়ে যাওয়ার পর আতাউর রহমানের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। প্রথমে তাঁকে গুলশানের একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও আইসিইউ সুবিধা না থাকায় পরে ধানমন্ডির আরেকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। গত শনিবার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া হয়। তবে পরে আবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে পুনরায় লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সোমবার দিবাগত রাত একটার দিকে লাইফ সাপোর্ট খুলে দিলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
বাংলাদেশের নাট্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বহুমাত্রিক অবদানের জন্য পরিচিত ছিলেন আতাউর রহমান। ১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এই নাট্যজন স্বাধীনতাত্তোর মঞ্চনাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে বিবেচিত হন। তিনি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়–এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটক নির্দেশনার মাধ্যমে মঞ্চনির্দেশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’, ‘রক্তকরবী’, ‘এখন দুঃসময়’ ও ‘অপেক্ষমান’সহ অসংখ্য নাটক নির্দেশনা দেন। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের বাইরেও তিনি ‘ম্যাকবেথ’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ ও ‘নারীগণ’সহ বিভিন্ন নাটক মঞ্চস্থ করেন।
শুধু মঞ্চেই নয়, শিক্ষকতা, লেখালেখি ও অভিনয়েও সক্রিয় ছিলেন আতাউর রহমান। তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘প্রজাপতি নিবন্ধ’, ‘মঞ্চসারথির কাব্যকথা’ ও ‘নাটক করতে হলে’। এছাড়া তিনি টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন।
সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নাট্য আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তিনি ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট–এর বাংলাদেশ শাখা এবং পরবর্তীতে বিশ্ব শাখার সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। দেশের সংস্কৃতি ও নাট্যাঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন।
