ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে নাটোরে একটি বড় অঙ্কের ব্যাংক লেনদেনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। নাটোর-২ (সদর ও নলডাঙ্গা) আসনের এক প্রার্থীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সোনালী ব্যাংক থেকে ইসলামী ব্যাংকে পাঠানো প্রায় চার কোটি টাকার একটি সন্দেহজনক লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নাটোর জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও অভিযোগের ধরণ
নাটোর-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু মঙ্গলবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, ঢাকা থেকে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় সোনালী ব্যাংক নাটোর শাখার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক নাটোর শাখার একটি নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে প্রায় চার কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়। নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ নাটোরে আসায় তিনি সেটিকে ‘ভোট কেনাবেচা’ বা নির্বাচনের পরিবেশ কলুষিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
রুহুল কুদ্দুস তালুকদারের মতে, সাধারণ জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করতে এই অর্থ কালো টাকা হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। বিষয়টি জানতে পেরেই তিনি অবিলম্বে নাটোর জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন এবং লেনদেনটি স্থগিত করার জোর দাবি জানান।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও ব্যাখা
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। ইসলামী ব্যাংক নাটোর শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) রেজাউল করিম দাবি করেছেন, এই লেনদেনটি সম্পূর্ণ নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ। তিনি যুক্তি দেন যে, ভোটের সময় কয়েকদিন ব্যাংক বন্ধ থাকবে এবং সাধারণ মানুষের নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে এটিএম বুথগুলোতে পর্যাপ্ত টাকা সরবরাহের প্রয়োজন হয়। সেই উদ্দেশ্যেই চার কোটি টাকার একটি চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, সোনালী ব্যাংক নাটোর প্রধান শাখার এজিএম উজ্জ্বল কুমার জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় এবং তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী লেনদেনটি বর্তমানে স্থগিত রাখা হয়েছে।
নিচে এই ঘটনার সাথে জড়িত পক্ষ ও গৃহীত ব্যবস্থার সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
| সংশ্লিষ্ট পক্ষ | ভূমিকা/অবস্থান | গৃহীত পদক্ষেপ |
| সোনালী ব্যাংক, নাটোর | প্রেরক শাখা | ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে লেনদেন স্থগিত |
| ইসলামী ব্যাংক, নাটোর | প্রাপক শাখা | এটিএম বুথের জন্য সংগৃহীত টাকা বলে দাবি |
| রুহুল কুদ্দুস তালুকদার (দুলু) | অভিযোগকারী (বিএনপি প্রার্থী) | কালো টাকা বিতরণের আশঙ্কায় লিখিত অভিযোগ |
| আসমা শাহীন (ডিসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তা) | সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী | সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু |
প্রশাসনের অবস্থান ও নির্বাচনী গুরুত্ব
নাটোরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আসমা শাহীন জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে যেকোনো ধরনের বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন নজরদারির আওতায় থাকে। একজন প্রার্থীর সরাসরি অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের পরিবেশ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনের আগে এ ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সচেতন মহলের মতে, বড় অঙ্কের এই অর্থের উৎস ও গন্তব্যস্থল গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। নির্বাচনের এই শেষ সময়ে কোনো বিশেষ পক্ষ যাতে অর্থের জোরে জনমত প্রভাবিত করতে না পারে, সেজন্য প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
