নরেন্দ্রনাথ থেকে বিবেকানন্দ: স্মৃতির পথ ধরে

“উঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না”—এই আদর্শের প্রতীক স্বামী বিবেকানন্দ, ভারতের নবজাগরণের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র এবং আধুনিক ভারতের আত্মচেতনার অন্যতম স্থপতি। যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করা, সমাজসংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের মাধ্যমে দেশের চেতনাকে উজ্জীবিত করা—এই লক্ষ্যেই তার জীবন বিন্যস্ত ছিল।

জীবন পরিচয়

বিষয়তথ্য
জন্ম১২ জানুয়ারি ১৮৬৩
জন্মস্থানকলকাতা
পূর্ণ নামনরেন্দ্রনাথ দত্ত
পিতাবিশ্বনাথ দত্ত (আইনজীবী, যুক্তিবাদী)
মাভুবনেশ্বরী দেবী (ধ্যানমগ্ন ও নৈতিক দৃঢ়তা)

নরেন্দ্রনাথ দত্ত জন্মগ্রহণ করেন এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত পরিবারে। পিতার যুক্তিবাদ ও মাতার আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণই তাঁর চরিত্র ও দার্শনিক চিন্তার মূল ভিত্তি স্থাপন করে।

আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান ও রামকৃষ্ণ পরমহংস
ছেলেবেলা থেকেই নরেন্দ্রনাথের মধ্যে ছিল তীব্র আধ্যাত্মিক অনুসন্ধিৎসা। ঈশ্বরের সত্য উপলব্ধি খুঁজতে গিয়েই তিনি পরিচিত হন শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে। রামকৃষ্ণের সরলতা, ঈশ্বরানুভব ও সর্বধর্ম সমন্বয়ের দর্শন নরেন্দ্রনাথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি অবশেষে রামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য হয়ে আত্মপ্রকাশ করেন।

বিশ্বসভা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি
১৮৯৩ সালে শিকাগো বিশ্বধর্ম মহাসভায় হিন্দুধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করে বিবেকানন্দ ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তার ভাষণ “Sisters and Brothers of America” সমবেত শ্রোতাদের দীর্ঘ সময় ধরে করতালিতে ভাসিয়ে তোলে। এরপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তিনি বেদান্ত, যোগ ও হিন্দুধর্মের বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ ব্যাখ্যা দেন।

কর্মযোগ ও মানবসেবা
বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠা করেন Vedanta Society (আমেরিকা ও ইংল্যান্ড) এবং পরে ১৮৯৭ সালে রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন। তার দর্শনের মূলমন্ত্র—“মানুষের সেবাই ঈশ্বরসেবা”—কর্মযোগের মাধ্যমে বাস্তব সমাজসংস্কারকে প্রভাবিত করেছে। রামকৃষ্ণ মিশন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ত্রাণ ও চরিত্রগঠনে আজও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

প্রভাব ও উত্তরাধিকার
স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তা ও আদর্শ মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ ও সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন প্রভৃতি মনীষী ও জাতীয় নেতাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রতি বছর ১২ জানুয়ারি ভারতীয় যুব সমাজ তার জীবন ও আদর্শ স্মরণে জাতীয় যুব দিবস হিসেবে উদযাপন করে।

মহাপ্রয়াণ
১৯০২ সালের ৪ জুলাই, মাত্র ৩৯ বছর বয়সে, ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি পরলোকগমন করেন। স্বল্পায়ু হলেও তার জীবন ও বাণী চিরন্তন। আজও তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—

“উঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না।”